মহামারি ও বিচার অঙ্গন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আইনুন্নাহার সিদ্দিকা : বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যে আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় তা ইংরেজ শাসন আমলে তৈরি। প্রায় দুইশত বছর পূর্বে এ অঞ্চলকে শাসন করার সুবিধার্থে প্রণয়ন করা সেই আইন এই একবিংশ শতাব্দিতেও চলমান। সেই পুরানো কার্যবিধি মেনেই চলছে আমাদের বর্তমান বিচারব্যবস্থা। প্রচলিত প্রক্রিয়ায় আইনের দুটি অংশ- দেওয়ানি ও ফৌজদারি। জমি, সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ, অর্থ সংক্রান্ত বিবাদ, এই সমস্তই দেওয়ানি আইনের অন্তর্ভুক্ত। চুরি ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন প্রভৃতি অপরাধ ফৌজদারি আইনের অন্তর্ভুক্ত। এই দুই প্রকার মামলা কীভাবে পরিচালনা করা হবে তার জন্য আছে দেওয়ানি কার্যবিধি আর ফৌজদারি কার্যবিধি। এই বিধিগুলো অনুসরণ করে একটি মামলা নিষ্পন্ন করা হয়। আর এই দুই কার্যবিধির সাথে সম্পূরক একটি আইন আছে, তা হল সাক্ষ্য আইন। যে কোনও বিচারের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয় সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা। মামলায় কিভাবে সাক্ষ্য গ্রহণ হবে, কি কি প্রমাণ কিভাবে গ্রহণ করা হবে তার সবকিছুই বিস্তারিত আছে সাক্ষ্য আইনে। এই তিনটি কার্যবিধি আর আইন নিয়েই মূলত আমাদের দেশে বিচার কাজ পরিচালনা করা হয়ে থাকে। স্বাধীনতার পর বেশ কিছু নতুন আইন প্রণীত হয়েছে, কিন্তু সে সকল আইনসমূহের আওতার মামলাগুলোও পরিচালিত সেই পুরনো ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধি দ্বারা। আমাদের দেশে বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। সে হত্যা মামলা হোক অথবা ছোট কোনও চুরির মামলাই হোক, যা নিষ্পত্তি হতে লাগে কয়েক বছর। এমনকি কিছু কিছু মামলার ক্ষেত্রে দশকও পার হয়ে যায়। যেমন কোন অপরাধের বিচার সম্পন্ন হয়ার পর জানা গেল, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল বা যে শাস্তি পেয়েছে সে নিরাপরাধ। কিন্তু ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে এক দশকের বেশি। এই বিচারকালীন সময়ে সেই ব্যক্তিটি শুধু আদালত প্রাঙ্গণে আসা যাওয়া করেই কাটিয়ে দিয়েছে। এর মাঝে তার সামাজিক সম্মানের হানি হয়েছে, ঘটেছে পারিবারিক বিপর্যয়। কোনও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সে করতে পারেনি। এক কথায় বলা যায়, সেই মানুষটির জীবন হয়ে গেছে অর্থহীন। এমনও আছে একজনের দোষে অন্যজন জেল খেটেছে। যার অন্যতম উদাহরণ জাহালম, যে কিনা অপরাধী না হয়েও তিন বছর সাজা কেটেছে। অপরদিকে এমনও আছে কোন পিতা তার সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন আদালত প্রাঙ্গণে বিচারের অপেক্ষায়। তেমনই দেওয়ানি মামলাগুলোও চলে বংশ পরম্পরায়। প্রায় তিন পুরুষ পার হয়ে যায় একেক মামলার চুড়ান্ত ফল পেতে। মামলা পরিচালনার এই জটিল অবস্থা হয় প্রচলিত পদ্ধতির জন্যই। আইনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণেই মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মাসিক পত্রিকা ‘লিগ্যাল ইস্যু’, তাদের পঞ্চম বর্ষের সতেরো সংখ্যায় ২০১৮ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে যে, সে বছর সারা দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৫ লক্ষ ৬৯ হাজার ৭৫০টি। এখন একটি মামলা দায়ের করতে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় সংক্ষিপ্তভাবে তা বর্ণনা করছি। মামলা শুরু হয় কোন একজনের অধিকার খর্বের মধ্য দিয়ে বা কোনও একটি বিবাদ থেকে। ফৌজদারি ঘটনা হলে শুরু হবে থানা থেকে। দেওয়ানি হলে শুরু হবে আদালত থেকে। আদালতে বিচারকের সামনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু ধাপ পার হতে হবে। আবেদনটি তৈরি করবে কোনো এক আইনজীবী তার সহকারীর সাহায্যে। তারপর আবেদনপত্র জমা দিতে হবে আদালতের সেরেস্তায়। সেরেস্তাদার আবেদনপত্রটি মামলা আকারে নথিবদ্ধ করে তা পাঠাবেন বিচারকের সামনে। তারপর বিচারক মামলা পরিচালনা শুরু করবেন। সেখানে সাক্ষী, জেরা, প্রমাণ হাজির, দলিল উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো থাকে। উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শোনার পর বিচারক চুড়ান্ত ফলাফল জানান তার রায়ের মাধ্যমে। অপরদিকে থানায় অভিযোগ দেয়ার পর পুলিশ মামলা তদন্ত করবে, চার্জশিট দেবে, তারপর বিচারকের সামনে মামলাটি উপস্থাপন হবে এবং একইভাবে পূর্বের মত সাক্ষী প্রমাণ দ্বারা মামলার চূড়ান্ত রায় হবে। কোনো একটি জামিনের ক্ষেত্রে আবেদন করা থেকে শুরু করে জেল থেকে বের হওয়া পর্যন্ত প্রায় ২৯টি ধাপ পার হতে হয়। এর থেকে বোঝা যায় এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হতে এর সাথে কতজন সম্পৃক্ত থাকতে পারে এবং সংখ্যাটি অবশ্যই এক দুই জন থেকে অনেক বেশি। মামলা মোকদ্দমার জট নিরসনে ২০১৪ সালে আইন কমিশন বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- বিচারক নিয়োগ, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটানা শুনানি করা, সমগ্র বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করা ইত্যাদি (লিগ্যাল ইস্যু, ৫ম বর্ষ ১৭ সংখ্যা)। উল্লেখ্য সিদ্ধান্তের কতটুকু কি কার্যকর করা হয়েছে তা আমরা ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানেই বুঝতে পারি। এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হল, তা স্বাভাবিক অবস্থায় বিচারব্যবস্থার কিছু অংশ মাত্র। বর্তমান পরিস্থিতিটা ভিন্ন। আমাদের দেশসহ সারা পৃথিবী এখন একটি ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে মানব জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় ব্যস্ত। লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। উন্নত বিশ্বও নিজেদের অসহায় মনে করছে। মহামারির ফলে ভবিষ্যতে পৃথিবীর অর্থনীতি কোনদিকে মোড় নেবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। আমাদের দেশের সরকারও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনগণকে ঘরে থাকার অনুরোধ করেছে। এমন অবস্থায় আমাদের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। সারা দেশের জেলা জজসহ উচ্চ আদালতের কার্যক্রমও বন্ধ ছিল। সাধারণত আমাদের জেলা জজ আদালতসমূহে বছরে শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই ছুটি থাকে। আর উচ্চ আদালতে বছরে কয়েকবার স্বল্প সময়ের জন্য ছুটি থাকে। তবে সেই ছুটির সময়েও অবসরকালীন বিশেষ আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। মোটের উপর সারা বছরই বিচারিক কার্যক্রম চালু থাকে। কিন্তু একটানা সম্পূর্ণ বন্ধ বা ছুটি কখনোই হয়নি। সারা বছর কাজ করেও উল্লখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। একটি মামলার সাথে কতজন কতভাবে সম্পৃক্ত থাকে তা আগেই জেনেছি। সেই মানুষগুলো এখন সম্পূর্ণ বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে, তাদের আয়-রোজগার বন্ধ। কিন্তু করোনা সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। বর্তমানে সংক্রমণের হার বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে মৃত্যুর হার। আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার যে চিত্র আমরা জানি তাতে আদালতগুলো খুলে দিলে সংক্রমণের চিত্র কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। হয়ত এসব বিবেচনায় রেখেই সরকার আদালতগুলিকে স্বল্প পরিসরে জরুরি বিষয়সমূহ শুনানির জন্য অনুমতি দিয়েছে। আর তাই ভার্চুয়াল কোর্ট স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ অবস্থায় বিশেষ ব্যবস্থায় আদালত তার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ভার্চুয়াল অর্থ্যাৎ আদালতে না এসে অনলাইনে মামলা পরিচালিত হবে। বর্তমানে শুধুমাত্র জামিনের আবেদনসমূহ শুনানি করা হবে। ভার্চুয়াল কোর্টের এই পদ্ধতিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এখানে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল কোর্টে শুধু জামিন শুনানি হবে, কিন্তু বিচারকাজ বলতে যা বোঝায় যেমন- সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন, দলিলপত্র হাজির করা, আদেশ বা রায় প্রদান কোনটাই হবে না। অর্থ্যাৎ নতুন মামলা হচ্ছে কিন্তু নতুন পুরাতন কোনও মামলাই নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ফলে মামলার জট রয়েই যাচ্ছে। যেকোনও কর্মকাণ্ড শুরুর আগে আনুসাঙ্গিক কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। ভার্চুয়াল কোর্টের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ আইনজীবী ও বিচারক নতুন এই প্রযুক্তির সাথে তেমন পরিচিত বা অভ্যস্ত নন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা তেমন নেই। এমনকি রাজধানীতেও তা অপ্রতুল। যে সার্ভারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয় তা অনেক সময়ই কাজ করে না। সর্বোপরি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজেই এই প্রযুক্তি কতজন ব্যবহার করতে পারবে বা কতজন এই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে তা বলা কঠিন। মহামারির সময়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাতে বিচারকাজ পরিচালনা করা যায় তার জন্যই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এই ভার্চুয়াল কোর্ট স্থাপন। কিন্তু সেখানে শুধু শুনানি হবে জামিনের। যেখানে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টগুলো নিয়মিত জামিন শুনানি করে আসছে, এমনকি মহামারির সময়েও। যদিও সেখানে কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই দুঃসময়ে রাষ্ট্রের কোটি টাকা ব্যয় করে জামিনের কোর্ট স্থাপন করার বিয়য়টি ভাববার মত। ভার্চুয়াল কোর্টকে আমরা স্বাগত জানাই কিন্তু তা শুধুমাত্র জামিনের জন্য নয়। আমরা চাই এই কোর্টগুলো নিয়মিত মামলা পরিচালনা করুক। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় যে বাধা আসবে তা হল আমাদের সাক্ষ্য আইন। এই সাক্ষ্য আইন সংশোধন করতে গেলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধিও সংশোধন করতে হবে। এককথায় বলা যেতে পারে যে, আমাদের প্রচলিত আইন ও কার্যবিধিগুলিকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। মূল কথা হল, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল কোর্ত চালু করে জনগণকে কোন সুফল দেওয়া যাবে না, যদি না প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার আমল পরিবর্তন আনা যায়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করার ক্ষেত্রে শুধু আইনজীবী বা বিচারক নয়, সর্বস্তরের জনগণকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সেই সাথে বিচারব্যবস্থার সাথে জড়িত সংস্থাগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। দেশের সাধারণ অসাধারণ বিভাজনকে মুছে দিয়ে সত্যিকার অর্থে ‘আইন সকলের জন্য সমান’ তা নিশ্চিত করতে হবে। যা ভবিষ্যতে এধরনের দুর্যোগে আমাদের বিচারব্যবস্থা চালু রাখতে সহায়ক হবে এবং জনগণ তার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় কোনো বাধার সম্মুখীন হবে না। লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক,কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..