পথেই হবে পথ চেনা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ফররুখ হাসান জুয়েল : খুব সহজ ছিলো না, তবে সাহস ছিলো পথে নামার। সেই সাহসের ভিত ছিলো সহযোদ্ধা, স্বজন, সমস্বরের মানুষেরা। সেই সাহসের পথ ধরেই এই পর্যন্ত পথ চলা। ঠিক এখনই বলা যাবে না ‘পথের শেষ কোথায়, কী আছে শেষে’। ‘হাল ভাঙা পাল ছেড়া ব্যাথা’ নিয়ে কি উঠে আসতে হবে কিনা তাও জানি না। তবে এটুকু নিজেদের বলে রেখেছি যে, ‘হাল ছেড়ো না’। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামায় আত্মিক দৈন্যতা ছিলো না, ছিলো আর্থিক দুর্বলতা। পার্টির খুলনা বিভাগীয় যুব ক্যাম্প বাগেরহাট হয়ে যাওয়ায় সেই দুর্বলতা আরো অনেক বেশি মাত্রায় টের পাচ্ছিলাম। করোনা সংকট শুধুমাত্র বাগেরহাটের না হওয়ায় চিন্তাটা আরো বেশি ছিলো। অন্যান্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা নির্দিষ্ট এলাকা কেন্দ্রিক থাকায় পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া ছিলো অপেক্ষাকৃত সহজ। কিন্তু এই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ধরন সব অর্থেই ভিন্ন। তাই কাজের পরিকল্পনায় একের পর এক নিজেদের প্রশ্ন করেই আমাদের অগ্রসর হতে হয়েছে, হচ্ছে। যে কোনও সংকটে আমাদের মত নৈরাজ্যের রাষ্ট্রে ব্যবসায়ীদের লুটপাটের পথ প্রশস্ত করে। সেই পথে পদ্ধতিগত স্বতঃস্ফূর্ততায় সামিল হতে হয়, ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীদের। আমাদের দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগেই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপাদান মাস্কের খুচরা বাজার মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্য-সুরক্ষা ও বাজার ব্যবস্থায় নৈরাজ্যের লাগাম স্থানীয়ভাবে টেনে যতটুকু রাখা যায়, সেই বিবেচনা নিয়ে আমাদের মাস্ক তৈরীর কাজ শুরু হয়। মার্চ মাসের শেষ ভাগের ১২দিনে ১৮৪০০ মাস্ক তৈরি করে তা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে বাগেরহাটের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। সংখ্যার বিবেচনায় এ সংখ্যা খুবই কম। তবে, জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় জনসমাগম হয় এরকম স্থানে রিকশা, ভ্যান, অটোচালকসহ শ্রমজীবীদের মাঝে এগুলো বিতরণ করা হয়। মাস্ক গ্রহিতাদের মুখে মুখে সেই প্রচার বাজারে প্রচার হলে মাস্কের দাম কমাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে। মোট তৈরি করা মাস্কের ১০ভাগ তৈরি করা হয় শিশুদের উপযোগী করে। মাস্ক তৈরি কাজের সাথে সাথে পার্টির নিজস্ব শক্তি ও জনগণের সহায়তায় উপজেলাগুলোর বিভিন্ন স্থানে খাদ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। জেলার ১৭টি পয়েন্ট থেকে তার আশপাশের মানুষের খবর নিয়ে খাদ্য (চাল, ডাল, আলু, চিড়া) পৌঁছে দেয়া হয়, হচ্ছে। এর বাইরে যারা সরাসরি সাহায্য নিতে রাস্তায় নামতে পারে না, তাদের খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে। পূর্বেকার অভিজ্ঞতায় জানতাম জনগণের সহায়তা অনেক কমরেড নিজের জন্য নিতে চায় না। পার্টি কমরেডদের আবেগের সেই সরল সুরকে আমরা উপেক্ষা করতে পারিনি। অথচ, আমাদের অনেক পার্টি কমরেড ও গণসংগঠনের কর্মীদের আর্থিক অবস্থা প্রান্তিক পর্যায়ে। সেই সব কর্মীদের সহযোগিতার জন্য পার্টি ও গণসংগঠনের মধ্যে থাকা অপেক্ষাকৃত যারা স্বচ্ছল তাদের পরিবার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঐসব কর্মীদের সহায়তা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। পৃথিবীর নানা দেশের অভিজ্ঞতা, আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার সীমাহীন দৈন্যতা, সবকিছু মিলিয়ে আমরা পার্টি থেকে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করি।

জেলা প্রশাসনকে প্রথমে আমাদের শক্তিকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিলেও তারা কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়নি। সেই অবস্থায় বি.এম.এ’কে প্রস্তাব দিলে তারা গ্রহণ করেন এবং শুধু আমাদের পার্টিই নয়, সেই উদ্যোগে এখন সর্বজনীন করোনা স্বাস্থ্য সেবা টিম হিসাবে বাগেরহাটে কাজ করছে। যেখানে পার্টি কাজের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয়ভাবে দু’জন ডাক্তার পার্টির মাধ্যমে পাঠানো রোগীর ফ্রি চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। এই সব কর্মসূচির মধ্যেই কৃষকের ধানের বিষয় নিয়ে আমরা ভাবতে থাকি। অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, বোরো মৌসুমে আমাদের এলাকায় কৃষক ধান কাটার শ্রমিক সংকটে ভোগে। সাধারণত অন্যান্য এলাকা থেকে শ্রমিক এনে কৃষক সেই সংকট মোকাবিলা করে থাকে। করোনা পরিস্থিতিতে অন্য এলাকা থেকে শ্রমিক আনার স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকায় শ্রমিক সংকট আরো তীব্র হয়। যে কোনও সংকটেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি মাত্রায় বিপদে পড়ে। চাহিদা অনুযায়ী বাইরের শ্রমিক আসা অনেকটা অনিশ্চয়তা থাকায় স্থানীয় স্বল্পসংখ্যক শ্রমিকের ওপর কৃষকের নির্ভরতা বেড়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। সেই সংকটে শ্রমিক পাওয়ার প্রতিযোগিতায় স্বভাবতই পিছিয়ে যাবে প্রান্তিক চাষি, বর্গা চাষি, সেটাও স্বাভাবিক। এইসব বিষয় মাথায় নিয়েই এপ্রিল মাসের প্রথম থেকেই আমরা পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি, যুব ইউনিয়ন ও ক্ষেতমজুর সমিতি ব্রিগেড গঠনের মাধ্যমে, দরিদ্র কৃষকের ধান কাটায় সহযোগিতা করার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ১৮ এপ্রিল মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে, ১৯ এপ্রিল আমরা মাঠে নেমে পড়ি। আমরা ঘোষণায় স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন, পরস্পরের ধান কাটায় ঐতিহ্যবাহী রীতি সামনে নিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। এই কর্মসূচি খুব অল্প সময়েই জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়। শ্রমিক সংকট থাকায় স্থানীয় অন্যান্য পেশার শ্রমিক (রিকশা, ভ্যান, অটো চালক, মিলে কাজ করা শ্রমিক, ঠেলা গাড়ি চালকসহ শহুরে অন্যান্য শ্রম পেশায় নিয়োজিত শ্রমিক) যারা বেকার বসে আছে, তাদের সংগঠিত করে বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সাথে যোগাযোগ করিয়ে ধান কাটায় নিয়োজিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আমাদের পক্ষ থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানকাটার কাঁচিও সরবরাহ করা হয়। এই কর্মসূচিও এখন চলমান। এই কর্মসূচিতে সমগ্র দেশে কতটুকু ধানকাটা হয়েছে, তাতে প্রান্তিক চাষীদের কতটুকু উপকার হয়েছে, সেই হিসাব বের করা হয়তো যাবে; তবে সংকট যে সৃষ্টিও করে, সেই সৃষ্টির সামাজিক শক্তি যে কত হতে পারে তার আর্থিক হিসাব আমরা মেলাতে পারব না। ধানকাটা কৃষকের সাময়িক সংকট। সেই সংকট ভালো হোক, খারাপ হোক, কৃষক পার করবে। কিন্তু কৃষকের মূল যে সংকট, সেই সংকট কৃষক কিভাবে পার করবে? সেই সংকটের মূল হচ্ছে কৃষকের উৎপাদন ও বিক্রয় ব্যবস্থা। এই মহা দূর্যোগে সরকারের সর্বশক্তি দিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব থাকলেও সেই দায়িত্বের ধারে কাছে না গিয়েই বলছে এতো ধান কিনে তার রাখার জায়গা নেই। আমরা সেই সমাধানের আশু করণীয় হিসাবে ধান রাখার জন্য বন্ধ থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান কাজে লাগানোর কথা প্রশাসনকে

যেমন বলেছি, বলেছি হাটে-মাঠে-পথে মানুষের মাঝে। মাস্ক তৈরি থেকে বিতরণ, সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি সহ যাবতীয় সব কর্মসূচিই চলছে পরস্পর পরস্পরের হাত ধরে। এই সব কর্মসূচির ক্ষেত্রে আমরা আমাদের সামর্থ্য জানতাম, দক্ষতা জানতাম। কতটুকু করতে পারব, কতদূর হাটতে পারব, তাও জানতাম। আর জানতাম, পথে হাঁটলে-মাঠে নামলে মানুষের সরল-স্বতঃস্ফূর্ততা আমাদের পথ দেখাবে। তাৎক্ষণিক কাজ হিসাবে এইসব কাজের মধ্যে, কৃষকের সবজি উৎপাদন ও বিক্রির ব্যবস্থা নিয়ে খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে একটা কাজ আমরা শুরু করেছি। এক কথায় বললে, ‘উৎপাদক ও ক্রেতা সমবায় বা সমন্বয়’ গড়ে তোলা। এই কাজটা অনেকটা নিজেদের শিক্ষার জন্য। ঘটনায় নিজেদের ফেলে উঠে আসার প্রতিবন্ধকতা কি কি তার ধারণা নেওয়ার জন্য। আমরা জেলার যেসব এলাকার উচ্চে-করলা, শসা, ঢেড়স এই জাতীয় সবজি বেশি হয়, সেই সব এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ৫/৭ জন করে ক্ষুদ্র কৃষককে বীজ দেওয়ার কাজ শুরু করেছি। এই বীজটা অবশ্যই ‘পরবর্তী প্রজন্ম’ তৈরি করবে এমন বীজ। সেই বীজ থেকে যে ফসল কৃষক উৎপাদন করবে, সেই ফসল স্থানীয় পাইকারি দামের চেয়ে বেশি দামে আমরা কিনে নিয়ে নিজেরাই আবার ক্রেতা হতে চাই। ক্রেতা হিসাবে অবশ্যই বাজারের খুচরা দামের চেয়ে কম দামে কিনতে পারব বলে ধারণা। এই ক্রেতাদের পরিধি আপাতত পার্টি ও তার পরিচিত পরিবারগুলো। যে কোনো কাজে নামার আগেই সেই কাজের একটা ছবি আমরা একে ফেলি। তার কিছু মেলে, কিছু মেলে না। নতুন নতুন দৃশ্য আমাদের জীবনে জন্ম নেয়। কাজের আগেই আমরা স্পষ্ট করেই দেখেছিলাম স্বজন, সহযোদ্ধাদের সহযোগিতা, কর্মীদের ক্লান্তিময় হাসিমাখা মুখ, প্রত্যাশার মত করে না হওয়া কাজের প্রতি ভালোবাসা, এই সবই আমাদের চেনা দৃশ্য। কিন্তু আমরা কোনো অবস্থায় এই ছবি আঁকতে পারিনি যে, একজন করোনা আক্রান্ত মানুষ আমাদের বিদেশ থেকে সহযোগিতা পাঠাবেন। আমাদের ধারণায় ছিলো না কোন কোন পরিবার থেকে তাদের যাকাতের টাকা আমাদের হাতে তুলে দেবে। আমরা কোনও অবস্থায় চিন্তাও করতে পারিনি, পিতার মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজনের জন্য যে খরচটা হতো, সেই খরচের টাকাটা তুলে দেবে পার্টির হাতে। এইসব ভালবাসাদের ছবি আমরা আঁকতে পারিনি, আঁকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ত্রাণের কাজ নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই এক ধরনের মহান ভাবের মোহগ্রস্ততা পেয়ে বসে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ঘরনার কথায় বুদ হয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথাই ভুলে যাই। অবশ্যই আমরা সবসময় ত্রাণের কাজ করব না। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের বিপ্লবী মানবিকতা যেমন আমরা দেখাবো, তেমনিভাবে কোনও অবস্থায় এই বৈষম্যের সমাজ ও রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনাও আমরা ভুলে যাব না। বরং তা অধিকতর উপলব্ধির মধ্যে আনা এবং এটা ধরে অগ্রসর হওয়ার সময়টাও এখন। যে কোন সংকটে সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়। সংকটকালীন সময়ে সমাজে এমন সব মহান বিষয় ঘটতে থাকে, আয়োজন হতে থাকে, সৃষ্টি হতে থাকে, তার অনেক কিছুই আমরা আগে ভাবতে পারি না; কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে বাস্তবায়ন করতে পারি না। সংকটে সৃষ্টির সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দায়িত্ব বিপ্লবীদের। করোনার এই মহাসংকট আমাদের সেই দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়েছে। লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাগেরহাট জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..