করোনা মহামারি : নতুন অভিজ্ঞতা এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এস এ রশীদ : করোনা মহামারি সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য এক নতুন শিক্ষা, নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের শুরুটা হয়েছিল চীনের হুয়ানে। পরে যখন অন্যদেশে ছড়াতে শুরু করেছিল তখন আমাদের সরকার ব্যস্ত জন্মশতবার্ষিকী পালন নিয়ে। শাসক দলের মুখপাত্রের মন্তব্য, ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’। বিদেশ থেকে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসছে তখন আমাদের বিমান, স্থলবন্দরের স্ক্যানার বিকল, পরীক্ষা অপ্রতুল। যখন দেশে মাত্র ৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল তখন লকডাউন করা হল। আজকে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন শিল্পের মালিক বান্ধব সরকার খুলে দিচ্ছে গার্মেন্টস, কল কারখানা, শপিংমল, বাজার ইত্যাদি। মানুষের ঢল নামছে সর্বত্র। ফেরি পারাপার খুলে দেয়া হয়েছে, মানুষ গাদাগাদি হয়ে পারাপার হচ্ছে। মানুষ প্রশ্ন তুলছে সরকারের কাছে- জীবন আগে না জীবিকা আগে? শুরু থেকেই মানুষ বলতে থাকেন লকডাউন মানবো কিন্তু কী খাবো? জীবিকার সন্ধানে মানুষ ঘরের বাহির হতে শুরু করে। একটা করোনা পরীক্ষাকেন্দ্র দিয়ে শুরু হলেও এখন সংখ্যটা কিছু বেড়েছে, তবে এখনও অপ্রতুল। প্রয়োজন প্রতি জেলায় একাধিক কেন্দ্র স্থাপন। প্রথম থেকেই চিকিৎসক-সেবিকা-স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। আবার পিপিই ও মাস্ক নিয়ে নানা কেলেংকারিও হয়েছ। মানুষকে বলা হয়েছে- ‘ঘরে থাকুন, খাবার পৌঁছে যাবে’, কিন্তু সকল মানুষকে খাবার পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ত্রাণ লুটপাট, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি হয়েছে। কর্মহীন গরিব মানুষ শুধু নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও চরম অভাব অনটনের মধ্যে পড়ে গিয়েছে। ফলে ধনিক শ্রেণি ছাড়া সকলেই আজ এক কাতারে চলে এসেছে। অনাহারি মানুষকে শ্রেণি সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সরকার বলছে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে, একজন মানুষ না খেয়ে মরবে না। এই সময় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘পৃথিবীতে যত মন্বন্তর হয়েছে কোনটাই খাদ্যের অভাবে নয়, সুষম বণ্টনের অভাবে হয়েছে’। পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ কমিউনিস্ট/বাম শাসিত দেশ, রাজ্য আজ করোনা নিয়ন্ত্রণ, মানবিক সাহায্য, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে করোনা মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) শুরু থেকেই মানুষের সাথে থেকে মানুষের জন্য কাজ করছে। আমরা খুলনায় ৩ মার্চ পার্টির সভা করে সচেতনতামূলক লিফলেট ড্রাপ করে ৮ মার্চ ছাপিয়ে রাস্তায়, দোকানে বিলি শুরু করি। উপজেলা থানা পর্যায়ে বিতরণ করা হয়। অনেক থানা/উপজেলায় জেলা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকেন। খুলনা থেকে বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা,যশোর, মাগুরা,সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও নড়াইল এর দুটি অঞ্চলে কমবেশি লিফলেট পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কমিটি করোনা বিষয়ক লিফটের সফট কপি নিয়ে ছাপিয়ে সারাদেশ বিতরণ করে। খুলনাতে আমরা প্রথম হাতধোয়া কর্মসূচি শুরু করি। পার্টি নেতৃত্বের অর্থে ছাত্র ইউনিয়ন ৫ হাজার মাস্ক তৈরি করে বিতরণ করে। যুব ইউনিয়নের হাতধোয়া, হ্যান্ড সেনিটাইজার বিতরণ করে। প্রথমদিকে আমরা খুলনা শহরে হতদরিদ্র কর্মহীন মানুষের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করি। হ্যান্ডলিংক শ্রমিক, পাটকল,হকার,গৃহনির্মান শ্রমিক,হরিজন গৃহ পরিচারিকা, রিকসা শ্রমিক, কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুলসহ এক হাজার মেহনতী মানুষকে আমরা ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা নজর দেই আমাদের পার্টি কর্মীদের প্রতি, তাদের পরিবারের প্রতি। এই সময় কর্মহীন হওয়া পার্টি কর্মীদের তালিকা করে শহর থেকে গ্রাম উপজেলা থেকে শাখায় খাদ্য সামগ্রী, নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে জেলা থেকে বলা হয় প্রতি শাখার সদস্যরা কিছু কিছু সহযোগিতা দিয়ে শাখার অসচ্ছল কমরেড বা এলাকার হতদরিদ্র মানুষকে তা যত কম হোক না কেন পৌঁছে দিতে হবে। বেশ কিছু শাখা ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে, অন্য শাখায় কাজ চলছে। খুলনাতে লগ ডাউনের তৃতীয় দিন আমরা খাদ্য দাও, চিকিৎসা দাও দাবীতে নগরীতে প্রথম মানববন্ধন করি। পরে সকল গণসংগঠন যৌথ ভাবে একই কর্মসূচি পালন করে। ফরিদপুরে দিনের পর দিন জীবাণুনাশক ছিটানো, ঢাকা শহরের বিভিন্ন থানা কমিটি কাজ, অনেক জেলাকমিটি নানামুখি কাজ, বাগেরহাট, হাওর অঞ্চলের পার্টি কমরেডদের ধান কাটা আমাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। শুরু থেকে আমাদের অনেক নেতাকর্মী স্বেচ্ছায় হোম কোরেন্টাইনে চলে গিয়েছিলেন। যদিও আামরা বয়স্কদের ঘরে থাকার কথা বলেছিলাম। মানববন্ধন ও একই দিনে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি প্রদান করতে গেলে জেলা প্রশাসক ত্রাণ বিতরণে দলীয়করণের কথা বলা হয়েছে অভিযোগ তুলে নেতৃবৃন্দের সাথে দুর্ব্যবহার করে। সিটি মেয়র ফোনে সিপিবি অফিস জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এ খবর পার্টি নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে জেলা নেতৃবৃন্দের কাছে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানতে চাওয়া। পার্টি অফিসে হাজির, সোসাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ, খুলনার করোনা যুদ্ধের কর্মকাণ্ডে আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানা কমিটি নিজেদের উদ্যোগে মানববন্ধন করে। ‘ত্রাণ চোরের বিচার কর’ পোস্টার লাগাতে গেলে আওয়ামী লীগের নেতারা পার্টি কর্মীদের আটকিয়ে রেখে পুলিশ খবর দেয়। পুলিশ দুই কমরেডকে গ্রেফতার করতে চাইলে সাধারণ জনগণের প্রতিবাদের মুখে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণার দিনই আমরা জেলা করোনা কন্টোল টিম গঠন করি। উপজেলা/থানা মিলিয়ে ৩০ জনের স্বেচ্ছাসেবক টিম প্রস্তুত করি। সপ্তাহে কমপক্ষে দুদিন উপস্থিত হয়ে সভা হয় টিমের। প্রতিদিন মোবাইলে আলোচনা হয় নানা বিষয় নিয়ে। একটা ইজিবাইক এম্বুলেন্স সার্ভিসের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শহরের শ্রমজীবী মানুষকে সম্পৃক্ত করে কৃষকের ধান কেটে দেয়া শুরু করা হয়েছে। নতুন অভিজ্ঞতা হলো কৃষক আমাদের কাছে পেয়ে খুবই খুশি, কৃষক পরিবারের সদস্যরা আমাদের কি খাওয়াবে তার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন।গ্রামের অন্য মানুষ ছুটে আসে আমাদের সাথে দেখা করতে। কৃষকরা তাদের ক্ষেতের সবজি শহরের গরিব মানুষের জন্য বস্তা ভরে আমাদের অটো গাড়িতে তুলে দিয়েছেন, যা আমরা শহরে এসে বিতরণ করেছি। এটাকে আমার কাছে মনে হয়েছে গরিব কৃষক ও শহরের মেহনতি মজুরের সেতুবন্ধন। আমরা শ্লোগান উচ্চারণ করি “ক্ষেতে কৃষাণ কলে মজুর জোট বাঁধ তৈরি হও”। আমদের পূর্বপুরুষরা ভাষা আন্দোলন করেছেন। টংক, নানকার, তেভাগা, আন্দোলন করেছেন। আমদের পার্টির নেতা কমরেড মনি সিংহ, কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ,মনজুরুল আহসান খান, শহিদুল্লাহ চৌধুরী, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ, মোঃ শাহ আালম সহ অগণিত নেতা কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আমার শৈশবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তখন আমি ৫ম শ্রেণির ছাত্র। মার্চের ২৭ তারিখ আমরা স্কুলে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে, ‘পাক সাদ জমিন সাদ বাদ’ শুরু করেছি, প্রধান শিক্ষক ছুটতে ছুটতে এসে আমাদের থামিয়ে হাতে লাল সবুজ পতাকা দিলেন, চাঁদ তারকার পতাকা নামিয়ে আমি স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’-----গান গেয়েছিলাম। নকশালরা আমাদের বাড়ি দখল করে ধানের গোলা খুলে গরিব মানুষের মধ্যে ধান বিলিয়ে দিয়েছিল। শ্রেণি শত্রু খতমের নামে ধনিকদের গলা কেটে হত্যা করতে দেখেছি। আবার আমাদের একই বাড়ি রাজাকাররা দখল করে ক্যাম্প করেছে। মানুষ হত্যা করেছে, লুটপাট করেছে। লুটের গরুর মাংস আমার মা আমাদের খেতে দেননি। অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছি নভেম্বরের শুরুর দিকে। মুক্তিযোদ্ধারা যখন রাজাকারদের হটিয়ে বাড়ি পুনর্দখল করে সাথে আামার বাবা কাকা বড় ভাইয়েরা ছিলেন। তখন আবার নতুন জীবন। দেড় মাস ক্যাম্পে থেকেছি, আমার মা চাচিরা রান্না করেছেন, আমরা পরম যত্নে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পরিবেশন করেছি। শত শত অস্ত্রের মধ্যে রাত কাটিয়েছি। ট্রেন্সে থেকেছি, কিষাণদের খাবার পৌছে দেওয়ার নামে অনেক দূরে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে এসেছি। শত্রু পক্ষের গোপন খবর নিয়ে এসেছি। রাজাকারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধের সময় বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগে চিৎকার করে, “মুক্তি আমাদের হবেই” উচ্চারণ করতে দেখেছি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় মিছিলে গগনচুম্বী শ্লোগান আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমাদের পার্টি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান দল ছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন আমরাই চাই। করোনা মহামারি সারা বিশ্ববাসীকে যেমন করে আতঙ্কগ্রস্ত করেছে তেমনি মানুষ নতুন অনেক শিক্ষা গ্রহণ করছে। গরিব মধ্যবিত্ত শ্রমিক কৃষক একই কাতারে মিলিত হয়েছে, সকলের অভাব, পেটে ক্ষুধা। করোনা ভাইরাসে মহাবিপর্যয় মোকাবিলায় মানুষ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সকল কমিউনিস্ট কর্মীকে এ কাজে এগিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সকলে এখনো পারেনি। করোনা ভাইরাসতো আর মানুষের দিকে ছুটে আসবে না যতক্ষণ না আমি ভাইরাসের কাছে যাচ্ছি। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে, অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাকে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আমদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভা হয়েছে। এখন প্রয়োজন জেলা, উপজেলা, শাখা সভা করা। আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ প্রত্যেক সদস্য ন্যূন্যতম কিছু অর্থ সহযোগিতা দিয়ে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে, কৃষকের ধান কেটে দিয়ে ধান সংগ্রহ করে, মুষ্টি চাল তুলে, তহবিল গঠন করা সম্ভব। মানবজাতির সবচেয়ে দুঃসময়ে আমরা যদি মানুষের পাশে থাকতে না পারি, তাহলে মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গের যে শপথ আমরা নিয়েছি তার কোনও মূল্যই থাকবে না। আমরা যারা এখনও কাজে নামতে পারিনি তাদের জন্য সময় শেষ হয়ে যায়নি। মানুষের জীবন তো একটাই, ফলে যারা আমরা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি, করোনা যুদ্ধকে অনেকটা মুক্তিযুদ্ধ মনে করে সেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারি না কি? আমাদের শত বছরের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা দিয়ে নিশ্চয়ই আমরা করোনা ভাইরাসের মহাবিপর্যয় মোকাবিলা করে বিজয় অর্জন করতে পারবো। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আগামী দিনের সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগাবে। লেখক: সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..