করোনাকালে রাজনীতির দূরভাষ্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
লেলিন চৌধুরী: এক. কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারির কালে মানুষ ভালো নেই। বর্তমান সময়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা এই সংকট মোকাবিলায় সফল হতে পারেনি। প্রতিটি প্লাবন বা মহাপ্লাবন সর্বব্যাপী ধ্বংসের অগণন চিহ্ন রেখে বিদায় হয়। কিন্তু একই সাথে চরাচরব্যাপি পলিমাটির উর্বর স্তরের আস্তরণও ছড়িয়ে যায়। দূরদর্শী চাষি বন্যার সময়েই স্থির করে রাখে নবপলিসমৃদ্ধ জমিতে কী কৌশলে কোন ফসলের চাষ করবে। করোনা পরবর্তী পৃথিবীর উন্নয়ন ভাবনা, অর্থনৈতিক বিন্যাস, পরিবেশচেতনা, শাসনব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসবে অথবা পরিবর্তনের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে। দেশীয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য। এরকম অবস্থায় যারা প্রস্তুত থাকবে- সাধারণজনের বোধগম্য ভাষায় পরিবর্তনের ইশতেহার তৈরি করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে মানুষ তাদের ওপরই আস্থা রাখবে। প্রতিটি সর্বব্যাপি দুঃসময় ও দুঃখকাল মানুষের সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্কে মানবিক বোধের সঞ্চার বৃদ্ধি করে; সভ্যতা ও উন্নয়নের সাথে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের অধিকতর কল্যাণমুখি অবস্থানকে নির্দেশ করে। দুই. বাংলাদেশে সাধারণজনসহ ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিবৃত্তির নানামুখি চর্চাকারী মানুষের মধ্যে একধরনের পুলিশবিরোধী মনোভব দীর্ঘকাল যাবৎ বিদ্যমান। এই উপমহাদেশে ‘পুলিশ’ ধারণার আগমন ঘটে ব্রিটিশ শাসনকালে। এটি ইউরোপীয় সভ্যতার ‘ফসল’। নিঃসন্দেহে দেশীয় পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজদের উত্তরাধিকার হিসাবে পুলিশের যুগ শুরু হয়। ব্রিটিশ আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রধান ভূমিকা পালন করতো। ক্রমান্বয়ে বৃহত্তর ভারতবাসীর মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন জন্ম নিতে থাকে। এই স্বপ্নের প্রকাশকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে ব্রিটিশ শাসক পুলিশি শক্তিকে ব্যবহার করে। সেসময় পুলিশের অবস্থান ছিলো গণআকাঙ্ক্ষার বিপরীতে। ঘৃণা ও ভীতির সম্মিলিত প্রতীক হিসেবে পুলিশকে গণ্য করা হতো। সাথে যুক্ত হয়েছিলো পুলিশের উৎকোচ গ্রহণ। ব্রিটিশ পুলিশের ধারাবাহিকতায় এলো পাকিস্তানি পুলিশ। পূর্ববর্তী সকল নেতিবাচক ঐতিহ্যকে ধারণের সাথে সাথে পাকিস্তানি পুলিশ আরো একধাপ বেশি মানববিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। তৎকালীন আদিবাসী নেতা ইলা মিত্রের ওপর সংঘটিত বর্বরতম যৌন নির্যাতনের ঘটনা পাকিস্তানী পুলিশের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠে। বাংলাদেশের মহাগৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনী অতুলনীয় দেশেপ্রেমিক ভূমিকা পালন করে। অবশ্যম্ভাবী গণপ্রত্যাশা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশে পুলিশের অভিযাত্রা হবে বাঙালির সদ্য উদিত নবসূর্যের নবীন রশ্মিকে ধারণ করে। পুরাতন পরিচয়ের সকল গ্লানি সকল হীনকর্মের উত্তরাধিকার-বন্ধন ছিন্ন করে তারা নব অর্জিত দেশ গড়ার লড়াইয়ে শামিল হবে। জনভাবনা ছিলো এই বাহিনীর নামটিতেও ‘পুলিশ’ শব্দের উপস্থিতি থাকবে না। পৃথিবীর অনেক মুক্তিপ্রাপ্ত দেশে এই ধারণার বাস্তবায়ন ঘটেছে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নাম বিডিআর থেকে বিজিবি-তে পরিবর্তনটিও কলঙ্কের বন্ধন ছিন্ন করার প্রয়াস। সময়ের পরিক্রমায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের পুলিশ ঔপনিবেশিকতার ধারামুক্ত হতে সমর্থ হয়নি। কিন্ত এই মহাদুর্যোগের সময় পুলিশ এক অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। করোনা মহামারির দুর্যোগকালে দায়িত্ব পালন অর্থাৎ জনমানুষকে মারীমুক্ত রাখতে গিয়ে শত শত পুলিশ সদস্য করোন আক্রান্ত হচ্ছে। তারপরেও পুলিশ তন্দ্রাহীন সতর্কতায় মানুষের পাশে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশবাহিনীর এই ভূমিকাকে দেশবাসী গভীর ভালোবাসায় সাধুবাদ জানাচ্ছে। জনগণ এই বাহিনীর করোনায় প্রয়াত সদস্যদের প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে আসছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথম পুলিশবাহিনী জননন্দিত হচ্ছে। তিন. মুক্তিযুদ্ধের আকাশস্পর্শী ভূমিকাকে মাথায় ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যাত্রা শুরু। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার মহান নেতার হত্যাকান্ডের পর থেকে স্বৈরাচারী এরশাদের পতনকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও জনগণের অবস্থান মনস্তাত্ত্বিকভাবে মুখোমুখি ছিলো। এরশাদ-কলঙ্ক দূরীভূত হওয়ার পর সেনাবাহিনী নানা দুর্যোগে মানুষের পাশে থেকেছে। পেশাগত দৃঢ়তা ও নিষ্ঠায় তারা জনমানুষের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। এজন্য একটি নিরপেক্ষ, হস্তক্ষেপবিহীন জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গে দেশবাসী সেনা মোতায়েনের দাবি করে। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে ত্রাণ অথবা অন্যকোন ধরনের সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজটি সুচারুভাবে একমাত্র সেনাসদস্যরাই করতে পারে। করোনার মহাদুর্যোগে সেনাবাহিনী অসাধারণ সৃজনশীলভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের জমিতে উৎপন্ন নানা শস্য,সব্জি,ফল নায্যমূল্যে সংগ্রহ করে নানা উপায়ে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজটি নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। সেনাবাহিনী/সেনাসদস্য/মিলিটারি - শব্দগুলোর সাথে সবসময় একটি ভীতির আবরণ জড়ানো থাকতো। স্বাধীনতার পর এই প্রথম সেনাসদস্যরা জনমনে ভীতি নয় ভালোবাসায় অভিষিক্ত হচ্ছে। বিষয়টি মুগ্ধকর। চার. বাংলা ভাষায় ‘আমলা’ শব্দটি অবহেলা, তুচ্ছতা, গালি ইত্যাদি একটি নেতিবাচক অভিধা। জনপ্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তারা আমলা নামে পরিচিত। সহজ বিষয়কে জটিল করা, দীর্ঘসূত্রিতা, সাধারণ মানুষকে ঘোরানো, জনঅর্থে বেতনাদি গ্রহণ করেও নিজেদের সেবকের পরিবর্তে শাসক ভাবা ইত্যাদি নানাবৈশিষ্ট্যে আমলাতন্ত্র জনমানসে চিত্রিত। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে যেসব বিষয়কে বাঁধা চিহ্নিত করা হয় তার মধ্যে একটি হচ্ছে আমলাতন্ত্র। করোনাকালে দেখা গেল দেশের জেলাগুলোতে ত্রাণ কার্যক্রমের কাজ পরিচালনা করছে আমলারা। মন্ত্রী, জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান অর্থাৎ জনপ্রতিনিধি নয় আমলারা মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছে আমলারা ধমকাধামকি যাই করুক দরিদ্র মানুষের খাবার চুরি করবেনা। পাঁচ. বাংলাদেশে বেশ কয়েক বছর যাবৎ কতোগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে আসছে। জনগণ যে ব্যাপারগুলোতে বেশি কষ্ট পাচ্ছে সেগুলো সমাধানের জন্য তারা দেশের নির্বাহী বিভাগ নয় বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘ইউজার ফি’ নামে টাকা গ্রহণ, বুড়িগঙ্গাসহ মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা নদীগুলো রক্ষায়, ফুটপাতে মোটর সাইকেল চালানো বন্ধ, মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা, হালদা নদীর ডলফিন হত্যা বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করাসহ অনেক অনেক বিষয় উচ্চ আদালতের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ সরকার যেসব কাজ করার জন্য দেশবাসীর অনুমোদনপ্রাপ্ত সে সকল দায়িত্ব পালনে তারা অসমর্থ সেগুলোকে সম্পন্ন করার জন্য উচ্চ আদালতকে নির্দেশ দিতে হয়। সরকার গঠন করে রাজনৈতিক দল বা দল সমুহ। জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা দেশবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অনুমোদন নিয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু সরকারের এই সামর্থ্যহীনতার বিষয়টি সচেতন মানুষকে পীড়িত করে তুলছে। করোনাবিরোধী মহাযজ্ঞেও শৃঙ্খলা এবং গতি আনতে উচ্চ আদালতকে নির্দেশকে দিতে হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় উচ্চ আদালতের প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাশা ক্রমশঃ উচ্চতর হচ্ছে। ছয়. দেশ পরিচালিত হয় রাজনীতিবিদ দ্বারা গঠিত সংসদ ও মন্ত্রীপরিষদের মাধ্যমে। সংসদ সদস্যগণ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করেন। সংবিধান এবং প্রণীত আইনকে ভিত্তি করে সরকার দেশ পরিচালনা করে। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রীপরিষদকেই সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিভাষায় সরকার বলা হয়। বর্তমানে চলমান করোনাবিরোধী যুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ইতোমধ্যে তার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং অনেকে তাকে পরিপূর্ণ ব্যর্থ বলে মত প্রকাশ করেছে। জনসাধারণের বড়ো অংশও সেরকম মনে করে। মন্ত্রিপরিষদে তার অবস্থান যেহেতু অটুট রয়েছে তারমানে হলো সরকার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাজকে সমর্থন করে ও সেগুলোর দায় গ্রহণ করছে। এটি গণমানুষের প্রত্যাশার বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ। অন্যদিকে মানুষকে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য হিসেবে রাজনীতিবিদ বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ বিবেচ্য নয়।এটি জনসাধারণ এবং সরকার দুইপক্ষই বিশ্বাস করে। ত্রাণ সহায়তা বিতরণ ব্যবস্থাটিকে পর্যবেক্ষণ করলে এ সত্যটি বেরিয়ে আসে। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক জনপ্রতিনিধি ত্রাণ চুরির অপরাধে বরখাস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এমনকি উচ্চতর অবস্থানের অধিকাংশ মানুষ মনে করে দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধির একটি ক্ষুদ্র অংশকে চিহ্নিত করে বরখাস্ত করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এই সংখ্যাটি অনেক বেশি। জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদের হাতে জনসাধারণের অর্থ,স্বার্থ,অধিকার ও নিরাপত্তা নিরাপদ নয়। করোনা দুর্যোগে দেশবাসীর সামনে দেশের বিদ্যমান রাজনীতিবিদের দৈন্যতা, অসামর্থ্য ও চরিত্র নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে। রাজনীতিবিদদের নিয়ে দেশের মানুষ চূড়ান্তভাবে বীতশ্রদ্ধ ও হতাশা। সাত. রাজনীতির ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে মানুষের আস্থা অন্যদিকে ধাবিত হওয়া দেশের জন্য একটি বিপদসংকেত। অবশ্যই দেশ পরিচালিত হবে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ দ্বারা। বি-রাজনীতিকরণ মানুষকে ক্রমান্বয়ে অধিকারহীন করে ফেলে। মানবিকতার বিকাশবান্ধব সমাজ ও দেশ গড়া এবং পরিচালনার জন্য রাজনীতির বিকল্প হচ্ছে একমাত্র রাজনীতিই। অর্থাৎ চৌর্যবৃত্তি ও অধিকার হননের রাজনীতির বিকল্প হচ্ছে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি। শেষকথা. করোনা-উত্তর কালে যে বিষয়গুলো সামনে আরও বেশি আসবে সেগুলোর সারকথা হলো- প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের কার্যক্রম ও বিন্যাসকে ব্যাহত না করে উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা। মানুষকে ভালো থাকতে হলে সকল প্রাণী ও বৃক্ষকে ভালো থাকতে হবে, ভালো রাখতে হবে নদী, সমুদ্র, পানি, বায়ু, মাটি, পাহাড় সব সব সবাইকে। আগামীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে এই সহজ দর্শন। নতুন জমিন প্রস্তুত হচ্ছে, নতুন ফসল তুলতে হবে, হে চাষি কোমড় বাঁধো, তৈরি হও। লেখক: শিশু, স্বাস্থ্য, পরিবেশ চিন্তাকর্মী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..