এ দৃষ্টান্ত জীবনের, মানুষের, মানবিকতার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
করোনার তাণ্ডবে সারাবিশ্বই তটস্ত। অদৃশ্য এই ভাইরাসের তাণ্ডব কবে শেষ হবে, পৃথিবী আবার কবে শান্ত হবে- এর সঠিক হিসাব এখনো অজানা। কেউ বলছেন, করোনার ভ্যাকসিন চলে আসলেই মহামারী রোধ করা যাবে। সেটা আসতেও আরো প্রায় দেড় বছর অপেক্ষা করতে হবে। কেউ আবার এই কথাও বলছেন, আগামী দুই থেকে পাঁচ বছর পৃথিবীকে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এসব বিতর্কের মধ্যে আবার খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই (হু) গত ১৫ মে ঘোষণা দিয়েছে, হয়তো এই করোনাভাইরাস কখেনাই পৃথিবীর ছায়া ছেড়ে যাবে না। করোনাভাইরাসের কারণে গোটা পৃথিবীটাই এখন ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ পরিণত হয়েছে। ঘরবন্দি মানুষের দিন শুরু ও শেষ হয়, আক্রান্ত মানুষের হিসাব আর লাশের সংখ্যা গুনে। আতঙ্কে মানুষ ভাবে, এখন কোন দেশ করোনার ‘হটস্পটে’ পরিণত হতে যাচ্ছে? কোন দেশের মৃত্যু কত, কোন দেশ মৃত্যুতে কোন দেশকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে! মৃত্যুর পরিসংখ্যান গুনাই যেন মানুষের অবধারিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে! এবং অবশ্যই সেই অক্ষেই মানুষকে প্রতিনিয়ত ঘোরপাক খাইয়ে রাখছে, আমজনতার ভাবনাকে জারিত করে রাখেছ পশ্চিমা-পূঁজিবাদী গণমাধ্যম। করোনাভাইরাসজনিত অন্ধকার যে দেশে যত বেশি, গণমাধ্যমের আলো সেখানেই তত বেশি। কিন্তু করোনাকে জয় করে যেসব দেশ সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীতে নতুন সকাল নিয়ে এসেছে, আশার আলো জ্বালিয়েছে- সেসব দেশকে গণমাধ্যম অন্ধকারে রেখে দিয়েছে। যেন এই মৃত্যুর শোকের মধ্যেও জানতে না পারে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামে কেউ করোনায় মারা যায়নি, যেন কোনোভাবেই কেউ বুঝতে না পারে বিপ্লবী কিউবা তার নিজের দেশে করোনাকে জয় করে ইউরোপের দিকে মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, যেন কেউ কোনোভাবেই উপলব্দি করতে না পারে পাশের দেশ ভারতের বামশাসিত কেরালা রাজ্যে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই সার্বজনীনতা। সমাজতান্ত্রিক চীন কীভাবে করোনাকে জয় করলো সেই গল্প না বলাই ভাল। হাস্যকর! ভিয়েতনাম নিয়ে বরং পশ্চিমা গণমাধ্যমের শুরুটাই এরকম- ‘ভিয়েতনাম। চীনের প্রতিবেশী, জনবহুল দেশ। রয়েছে দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পর্যাপ্ত অর্থও নেই।’ অবশ্য খুব যত্ন করে দেখলেই বোঝা যাবে- তার পাশেই হয়তো ‘অপারগতা সত্বেও’ লেখা রয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যু ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের মৃত্যুকেও ছাড়িয়ে গেছে।‘ বা ‘মৃত্যুপূরী ইতালি ও ব্রিটেনে চিকিৎসা দিতে গেছে কিউবার চিকিৎসক ও নার্সরা।‘ কিন্তু পুঁজিবাদী গণমাধ্যম এটা কখনোই বলবে না যে, কিউবার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, ‘এই করোনাভাইরাস থেকে বিশ্ববাসীর মুক্তির অভিন্ন পথ হচ্ছে মানুষে মানুষে সংহতি স্থাপন।‘ পুঁজির দালাল হিসেবে কাজ করা গণমাধ্যমের কাছে অবশ্য এটাও আশা করা বোকামি যে, তারা কিউবার মানবতাবাদী এই ঘোষণা প্রচার করবে; যেখানে কিউবা বলেছে, ‘চিকিৎসা সেবায় আমাদের যা কিছু সাফল্য, আমাদের যা কিছু আছে, তা আমরা পৃথিবীর দুর্গত মানুষের মাঝে ভাগ করে দিতে চাই।‘ (পুঁজিবাদ ভাবতেই পারে, সব দিয়ে দিলে এই দুর্গতির সময় আমাদের ব্যবসা হবে কীভাবে!) তার চেয়ে বরং পৃথিবীবাসীকে ভয়ের শাসনে রাখা ভাল। মৃত্যুকে মানুষ ভায় পায়, মৃত্যুর পরিসংখ্যানকেও। ১৬ মার্চের সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যু প্রায় ৮৮ হাজার। মাস পেরনোর আগেই সেটা লাখ ছুঁবে। তার বিপরীতে কিউবায় করোনাভাইরাসে মাত্র ২০০ জন আক্রান্ত হয়েছে, ভিয়েতনামে আক্রান্তের সংখ্যা আড়াইশর কাছাকাছি- এতো খুবই নগণ্য সংখ্যা! এটা গণমাধ্যমে প্রকাশ করলেই কী আর না করলেই কী! তাও যদি একটা মৃত্যু থাকতো- সেটা না হয় ভিন্ন কথা ছিল। কিন্তু কীভাবে কিউবা আর ভিয়েতনামে এলো অভূতপূর্ব সাফল্য? ইতিহাস জানে ও মানে, কিউবার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ধরে গড়া; যেখানে ব্যবসা নয়, মানবতাই প্রধান। ভিয়েতনামও গড়ে তুলেছে সেই সমাজতান্ত্রিক মডেলের স্বাস্থ্যসেবা। আর যে কারণেই করোনাভাইরাসের জন্মস্থান চীনের প্রতিবেশী হয়েও এবং দেশটির সঙ্গে প্রায় হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত থাকার পরও ভিয়েতনামকে স্পর্শ করতে পারেনি এই অদৃশ্য মৃত্যুদূত। শুরুতেই সমাজতান্ত্রিক দেশটির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, ‘এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা। প্রত্যেক ব্যবসা, প্রত্যেক নাগরিক, প্রত্যেক আবাসিক এলাকা এই প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে একেকটি দূর্গ।’ এই দুর্গ গড়েই মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের জয়গান গাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। মনে রাখতে হবে, এটা দৃষ্টান্তই, এটা কোনো সামান্য উদাহরণ নয়। আর দৃষ্টান্ত কেবল কমিউনিস্ট, বামপন্থীরাই রাখতে পারে। সারাক্ষণ যুদ্ধ আর মরণাস্ত্রের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা পুঁজিবাদের পক্ষে কখনোই জীবনের জয়গান গাওয়ার এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..