করোনায় পুঁজিপতিদের পক্ষে সরকারগুলো

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তাহসীন মল্লিক : করোনা ভাইরাসে (কভিড-১৯) প্রতিদিনই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। সপ্তাহের শেষ দিন পর্যন্ত মৃত্যু ছাড়িয়েছে ১০ হাজার। উৎপত্তিস্থল চীনে করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য আসলেও এখন সবচেয়ে বেশি মহামারি আকার ধারণ করেছে ইতালিতে। একইসঙ্গে ইরান ও স্পেনে। পাল্লা দিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঘনিয়ে আসছে মন্দা, মহাসংকট। অথচ করোনা ভাইরাস এমন সময় আঘাত হানলো যখন বিশ্ব একটি মন্দা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, করোনা ভাইরাস আরো ছড়িয়ে পড়লে চলতি বছর বিশ্বের জিডিপি ৪০ হাজার কোটি ডলার কমে যেতে পারে। তবে এসব কিছুর বাইরে আপাতত সংকট মোকবিলায় হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ব। করোনার কালো ছায়ায় বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ জুড়ে যেন স্তব্ধ অন্ধকার। দেখা দিচ্ছে খাদ্য, চিকিৎসাসহ মুখ্য চাহিদাসমূহের সংকট। চীন, ইরান, কানাডার মত দেশগুলো বিনামূল্যে তাদের দেশের জনগণকে সব রকম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে লড়ছে মহামারির বিরুদ্ধে। কিন্তু এর মধ্যেও বর্বরতা থেমে নেই পুঁজিপতিদের। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ব্রাজিলের সরকারও পুঁজিপতিদের পক্ষে চূড়ান্ত বর্বর রূপে আবির্ভূত হয়েছে। ১৬ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুল সংখ্যক পরিষেবা শিল্প কর্মী তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি হারান। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলির রেস্তোরাঁ, বার, সিনেমা থিয়েটার, লাইব্রেরি এবং সেলুনগুলো কোনো রকম সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া বন্ধ ঘোঘণা করা হয়েছে। এই খাতগুলোতে কাজ করা লক্ষ লক্ষ শ্রমিক হঠাৎ আয়ের উৎস ছাড়াই এবং কোনও জরুরি সঞ্চয় ছাড়াই কীভাবে বাঁচবেন তার কোনো সিদ্ধান্তও সরকারের তরফ থেকে দেয়া হয়নি। ইতোমধ্যে মার্কিন মালিকানাধীন বিশ্ব বিখ্যাত মেরিয়ট হোটেল চেইন ঘোষণা করেছে যে, তারা তাদের কয়েক হাজার কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করবে। ক্যালিফোর্নিয়া, ওহিও, ইলিনয়, ম্যাসাচুসেটস, মিশিগান, ওয়াশিংটন, কেন্টাকি, মেরিল্যান্ড, ইন্ডিয়ানা, রোড আইল্যান্ড এবং পেনসিলভেনিয়ার সব স্কুল, রেস্তোরাঁ এবং বার বন্ধ করার আদেশ জারি করেছে। আরও রাজ্যগুলিতেও একই আদেশ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসারে, ১১.৯ মিলিয়ন আমেরিকান রেস্তোরাঁ ও খাদ্য শিল্পে নিযুক্ত আছেন। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে এখন এই বেকারত্ব মোকাবিলা করতে হবে। মার্কিন প্রশাসন মূলত তার পুঁজিপতিদের দাস। মহামারি আক্রান্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পুঁজিপতিদের প্রিয় পদক্ষেপ অমানবিক হারে শ্রমিক ছাঁটাই। অস্ট্রেলিয়ায় করোনা ভাইরাস মহামারিজনিত কারণে দ্রুত বর্ধমান স্বাস্থ্য সঙ্কট এবং অর্থনৈতিক অশান্তির মধ্যে আসন্ন মাসগুলিতে অর্ধ মিলিয়ন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হবে। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকারের অর্থমন্ত্রী ম্যাথিয়াস করম্যান ঘোষণা করেন যে, তারা জোড়পূর্বক ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করবেন এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিককে এই জরুরি অবস্থায় চাকরিচ্যুত করবেন। অস্ট্রেলিয়ার সরকার ৩০ মার্চ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত সমস্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। সংস্থাটি একই সময়কালে তার অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল অর্ধেক কমিয়ে দেবে। ফলে বিমান পরিবহন সংস্থার বিপুল কর্মী তাদের চাকরি হারাচ্ছে। গত বছরই অস্ট্রেলিয়া সরাসরি ১০, ৬২০ জন কর্মচারী নিযুক্ত করেছিল। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর শ্রমিকদের বিনা বেতনে ছুটি নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার বিবৃতিতে স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায় যে, তারা জরুরি অবস্থার আড়াই মাস সময়কালে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং চাহিদা সংরক্ষণে অপারগ। ভার্জিন নামক আরেকটি অস্ট্রেলিয়ান বিমান সংস্থা বিপুল হারে শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। এমনকি সংস্থার কর্মকর্তাদের বাৎসরিক বেতন থেকে ১৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বোনাস। অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন খাতে প্রায় এক মিলিয়ন লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় আট শতাংশ। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকে তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পর্যটনের পাশাপাশি শত শত হোটেল বন্ধের পূর্বাভাস রয়েছে। এই দুই খাতের ১.৪ মিলিয়ন কর্মচারী শিগগিরই ছাঁটাইয়ের মুখোমুখি হবে। আস্ট্রেলিয়া সরকার দেশটির ৩.৩ মিলিয়ন কর্মীদের দুর্দশার বিষয়টি বিবেচনা করে এমন নীতিমালার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই শ্রমিকদের সাধারণ অবস্থাতেই চাকরির নিরাপত্তা নেই, অসুস্থ অবস্থাতেও ছুটির অধিকার নেই। ফলে চলমান করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষিতে আরোপিত জরুরি অবস্থায় তাদের প্রতি সরকারের এমন বিমাতাসুলভ আচরণ এবং বিপরীতে পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষার নগ্ন আয়োজন বর্বরতার সীমাকেও যেন অতিক্রম করে। করোনায় ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থি শাসক জাইর বলসোনারোর দানবীয় মুখোশ যেন আরও খুলে পড়েছে। বোলসোনারো ব্রাজিলের শ্রমিকদের হয় কাজ করতে নতুবা অনাহার থাকতে হবে- এমন অমানবিক বক্তব্য দিয়েছেন। ১৬ মার্চ ব্রাজিলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩১৪ ছাড়িয়েছে। একই দিনে মৃত্যুর তালিকায় চার জন যুক্ত হয়েছে। অথচ ১৫ মার্চ ফ্যাসিস্ট হিসেবে কুখ্যাত বলসোনারো সাও পাওলোতে তার সমর্থকদের নিয়ে বিশাল মিছিল করেছেন। মহামারি সম্পর্কে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সবচেয়ে ঘৃণ্য বিবৃতিতে বলসোনারো বলেন যে, শ্রমিকদের পক্ষে একমাত্র বিকল্প হল কাজ করা এবং মেনে নেয়া যে, তারা সংক্রমিত হবে, তা না হলে তারা ক্ষুধায় মারা যাবে। প্রত্যেকটি দেশের মতোই করোনা ভাইরাস সঙ্কটে সামাজিক দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তুলেছে ব্রাজিল। ব্রাজিলে জনসংখ্যার অর্ধেক হিসেবে সমান পরিমাণ সম্পদকে একচেটিয়া দখল রেখেছেন মাত্র ছয়জন পুঁজিপতি। শ্রমজীবী শ্রেণির বিশাল জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, স্যানিটেশন এবং সুরক্ষিত কাজের মৌলিক অবস্থা নেই। ব্রাজিলিয়ান শ্রমিকরা প্রধানত শহর অঞ্চলে বাস করে। যেখানে পরিবহন ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ এবং সবাই ট্রেন এবং বাসে চলাচল করে। এসব গণপরিবহনে ভাইরাসের বিস্তারের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। অথচ বলসোনারো জরুরি কোন পদক্ষেপের ব্যাপারে উদাসীন। শ্রমিকদের তথা ব্রাজিলের জণগণের জীবন রক্ষার বদলে তিনি হুমকি দিচ্ছেন কাজ না করলে অভুক্ত রাখা হবে। বলসোনারো দাবি করেছিলেন যে মহামারিটি মোকাবিলায় তিনি পাঁচ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য বরাদ্দ করবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এই যে ব্রাজিলের চিকিৎসা সেবা তার ৯৫ শতাংশ মানুষের সামর্থের বাইরে। চিকিৎসা খাতেও পুঁজিপতিদের দৌরাত্ম্য। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট প্রবল হলে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ তাঁদের চাকরি হারাবেন। মহামারির প্রভাবে আপাতত চাকরি হারাবেন অন্তত ৮০ লাখ মানুষ। আর দীর্ঘ মেয়াদে বেকার হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটি ৪৭ লাখ। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যাচ্ছে। ফলে পুঁজিপতিদের রক্ষা করতে সরকারগুলো যে পথে হাঁটছে তাতে আহূত ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল সম্ভব নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..