করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
লেলিন চৌধুরী : এক. কোভিড-১৯ সংহারক মূর্তিতে পৃথিবীব্যাপি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে চলছে। এই বৈশ্বিক মহামারীর হাত থেকে বাংলাদেশও মুক্ত থাকেনি। গত ৮ মার্চ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দেশে তিনজন কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশের তালিকায় যুক্ত হয়। চীনের উহানে শুরু হওয়ার পর রোগটি অন্যান্য দেশে ছড়ানো শুরু করে। সেসময় বাংলাদেশ এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি সংবাদ সম্মেলন করে জনসম্মুখে প্রকাশ করে। তত্ত্বগতভাবে সে প্রস্তুতি চমৎকার ছিলো। জনসাধারণ তাকে স্বাগত জানিয়েছিলো। দুই. কোনো বৈশ্বিক মহামারী ঠেকানোর প্রধান পদক্ষেপ হলো রোগী অথবা রোগজীবাণু বহন করতে পারে এমন লোকজনের বিদেশ থেকে দেশে আসাকে নিয়ন্ত্রণ করা, স্ক্রিনিং করা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। উচ্চ ঝুঁকির দেশ থেকে কাউকে দেশে প্রবেশ করতে না দেয়া হলো সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ। যদিও প্রবেশ করতে দেয়া হয় তাহলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে। রোগী হতে পারে এমন সন্দেহজনক ক্ষেত্রে আইসোলেশনে রাখতে হবে। তাই কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন হলো মহামারীটি ঠেকানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এদের সবাইকে কোভিড-১৯’র জন্য অবশ্যই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করতে হবে। কোভিড-১৯ মহামারী প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কৌশল হলো - পরীক্ষা করো, পরীক্ষা করো এবং পরীক্ষা করো (Test, Test and Test)। কিন্ত আমাদের কর্তৃপক্ষ ল্যাবটেস্টের ক্ষেত্রে অন্যায় কৃপাণতা দেখিয়েছে। বৈশ্বিক মহামারীর সময় বিমান, জল বা স্থল সকল বন্দরেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হয়। আমাদের দেশে বিমানবন্দরে কেমন নজরদারী চলছে তার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল সেখানকার অবস্থা সত্যিকার অর্থেই হ-য-ব-র-ল। উচ্চ ঝুঁকির দেশ থেকে হাজার হাজার লোক দেশে প্রবেশ করছে। তাদের ভালো করে স্ক্রিনিং হচ্ছে না। কোয়ারেন্টিনের বদলে তাদের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হচ্ছে। আমাদের মতো দেশে কতোজন মানুষের বাড়ি কোয়ারেন্টিনে থাকার উপযোগী সেটা কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে না। কোয়ারেন্টিনে থাকতে হলে একজনের জন্য একটি আলাদা শোয়ার ঘর এবং এর সাথে লাগোয়া বাথরুম বা প্রস্রাব-পায়খানা-গোসলখানা থাকতে হবে। গ্রাম, শহরতলী এবং শহুরে নিম্নবিত্তীয় লোকজনের বাড়িতে এরকম ব্যবস্থা একদমই নেই। যারা তাকে খাবার-পানীয় দিবে তাদের সতর্কতামূলক মাস্ক গ্লাভস পরতে হবে। বাড়ির অন্য কেউ সেই কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তির সাথে মেলামেশা করবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষটি দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, পিকনিকে যাচ্ছে, দাওয়াত খাচ্ছে, হাটবাজারে যাচ্ছে, লোকজনের সাথে কোলাকুলিও করছে। কেউ কেউ বিয়েশাদীর মতো কাজও করে ফেলছে। ফলে রোগী, সম্ভাব্য রোগী অথবা সন্দেহজনক রোগী বীরদর্পে রোগজীবাণু ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। প্রথম থেকেই কর্তৃপক্ষ সন্দেহজনক ক্ষেত্রে রোগ পরীক্ষায় অতিরক্ষণশীল আচরণ করতে থাকে। সকল পরীক্ষাকে একটিমাত্র কেন্দ্রে আবদ্ধ রাখে। এতে সেখানে সাধারণজনের অধিগম্যতায় বাঁধা তৈরি হয়। এটা করা হয় পরীক্ষার প্রধান উপকরণ বা কিটের স্বল্পতার জন্য। সবমিলিয়ে সারাদেশে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়। এখন এই সম্ভাবনা প্রকটিত হয়ে উঠেছে। তাই একটি জনপদকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে দূরপাল্লার পরিবহণ বন্ধ করা হয়েছে। জনসাধারণের জন্য অবশ্য পালনীয় স্বাস্থ্যবিধি ঘোষিত হয়েছে। ঢাকায় চারটি হাসপাতালকে প্রস্তুত করা হয়েছে। তিন. করোনা মহামারী মোকাবিলার জন্য অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী সার্বিক প্রস্তুতির চিত্রটি জনসাধারণের জন্য তুলে ধরা হয়নি। যেমন, চাঁদপুর বা মানিকগঞ্জের একজন গর্ভবতী নারী। তার প্রতিবেশী সদ্য ইটালি ফেরত। হোম কোয়ারিন্টিনে থাকতে বলা হয়েছে। সে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। নারীটির বাড়িতেও এসেছিলো। এই নারীর প্রসব ব্যথা উঠেছে। সে কোন হাসপাতালে যাবে? অথবা কোন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করবে? এ প্রশ্নের জবাব কি, কে দিবে? মেডিসিন, সার্জারি এবং অন্যান্য সবধরণের রোগীর ক্ষেত্রে একই সমস্যা। অর্থাৎ করোনা আক্রান্ত বা করোনা হতে পারে এমন রোগীর জন্য সারাদেশে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেটা দেশবাসীকে জানানো হয়নি। বলা যায় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ক নীতিমালা প্রস্তুত বা ঘোষিত হয়নি। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে একেবারে সামনের সারির যোদ্ধা হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা। সারাদেশে এদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়নি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সকল চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সুরক্ষা উপকরণ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তারদের ক্ষোভ অথবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ধর্মঘট আমরা দেখেছি। সবমিলিয়ে বলা যায় হাসপাতালগুলো এখনো তৈরি নয়। এপর্যন্ত ব্যাপকভাবে করোনা রোগী পরিবহনের জন্য উপযুক্ত যান বা অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত করা হয়নি। সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের মূল শক্তি বা মেইন আর্মস পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। কোনো একটি জনপদকে রেড জোন ঘোষণা দেয়া লক ডাউন করার সাথে সাথে ঐ অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষ, দিনমজুর, নিম্নবিত্তের মানুষের ভাতের যোগাড়ের কথা সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে। তাদের খাদ্য-পানীয়ের নিশ্চয়তা না থাকলে মানুষজন বিশৃংখল হয়ে উঠবে। এতে অরাজকতা তৈরি হবে। সমাজের শৃংখলা ভেঙ্গে পড়বে। চার. মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশের প্রতিটি অংশ বা সেক্টরকে প্রস্তুতি নিতে হয়। বাগাড়ম্বর ব্যতীত আমাদের রাষ্ট্র এবং জনগণ পুরো প্রস্তুত নয়। এই যুদ্ধের প্রথম ধাপে আমাদের দেশের প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত, অগোছালো এবং বাস্তবতা বিবর্জিত ছিলো। তাই আমরা বেশ পিছিয়ে পড়েছি, ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের বাকি অংশে ভালো করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন একটি জনসম্পৃক্ত বাস্তবসম্মত, দেশোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। এতে সরকার ও জনগণ একই সাথে লড়বে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইতে জিততে হলে এটাই একমাত্র পথ।
প্রথম পাতা
কর্তৃত্ববাদী শাসন হঠাতে হবে
রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের ঘোষণা ‘মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পাটমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি বাম গণতান্ত্রিক জোটের
বন্ধ নয়, মাত্র ১২০০ কোটি টাকায় পাটকলগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব
‘আওয়ামী লীগই রাষ্ট্রীয় পাটকলের কবর দিল’
বছরে একাধিকবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিল সংসদে
শ্রমিক ছাঁটাই-নির্যাতন, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বন্ধ না হলে সর্বাত্মক আন্দোলন
কমরেড হায়দার আকবর খান করোনাভাইরাসে আক্রান্ত
পাট শিল্প ধ্বংসের সরকারি সিদ্ধান্ত দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে
লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনায় শোক বাম গণতান্ত্রিক জোটের
বন্যা মোকাবেলা করুন, সীমান্তে হত্যা বন্ধে ভারতকে চাপ দিন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..