করোনা: চীনের অভিজ্ঞতা ও বিশ্ব পুঁজিবাদের ব্যর্থতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অভিনু কিবরিয়া ইসলাম : সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ছে নভেল করোনা ভাইরাস (nCoV বা SARS-CoV-2)সংক্রমণ। সংক্রমণের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে কিছু এলাকা সম্পূর্ণ লকডাউন করা হয়েছে বা করার প্রস্তুতি চলছে। যদিও বাংলাদেশে এখনো করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সীমিত পর্যায়ে আছে, এরমধ্যেই ১ জন মারা গেছেন এই সংক্রমণে। এখনো জানা যায়নি যে, এই ভাইরাস ইতিমধ্যেই বিদেশ ফেরত ব্যক্তি বা তার সংস্পর্শে আসা নিকটজন ছাড়া আর কারো মধ্যে ছড়িয়েছে কি না অর্থাৎ কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়েছে কি না। আগামী কিছুদিনে সংক্রমণ কী মাত্রায় ছড়াচ্ছে তার উপর নির্ভর করছে কতটুকু বিপর্যয়ের সম্মুখীন আমরা হতে যাচ্ছি। ইউরোপের মত বাংলাদেশে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু কিংবা বাংলাদেশে এটা কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে সেটা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা কঠিন। উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতার দেশগুলোতে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম বলে অনেকে বলছেন। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নোভেল করোনা ভাইরাস-এর উপর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাব আছে কি না তা নিশ্চিত নয়। সাধারণভাবে আমরা জানি, সাধারণত ফ্লু ধরনের ভাইরাল রোগগুলো কম তাপমাত্রায় বেশি ছড়ায়। করোনাসৃষ্ট সার্সও তাই ট্রপিক্যাল দেশগুলোতে বেশি ছড়ায়নি।১ সম্প্রতি ssrn এ আপলোড করা (৯ মার্চ লিখিত, সর্বশেষ রিভিশন ১৭ মার্চ) গবেষণা প্রবন্ধে (প্রিপ্রিন্ট ভার্সন) চীনের বেইজিং-এর বেইহাং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কম হয়। তারা বলছেন, উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম বা বর্ষা মৌসুমে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার হার কমে যেতে পারে।২ এক্ষেত্রে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় করতে বা মেরে ফেলতে অনেক বেশি তাপমাত্রার (৭০ ডিগ্রি) প্রয়োজন হয়। এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে আবহাওয়া উষ্ণতর হলে কিংবা আর্দ্রতা বেশি হলে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হার কম হতে পারে। তবে এই নভেল করোনাভাইরাস (nCoV) এর সংক্রমণ ছড়ানোর উপর উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাব সত্যিই আছে কি না, তা নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। তাই, গ্রীষ্মকাল আসছে বলে আমরা নিরাপদ, এমন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। বিভিন্ন এপিডেমিওলজিকাল স্টাডি বলছে, ভাইরাস সংক্রমণ কেবল আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে না, এটা জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মেডিকেল কেয়ারের গুণগত মানসহ আরো অনেক ফ্যাক্টরের উপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, প্রস্তুতির অভাব, স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, দুর্বল হাইজিন প্র্যাকটিস ইত্যাদি এই নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণকে মহাবিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করে না। এটা সত্য যে, নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুহার অন্য অনেক ভাইরাসের তুলনায় কম। এমনকি অন্যান্য করোনা ভাইরাস এপিডেমিক যেমন MERS - এ মৃত্যুহার যেখানে ছিল শতকরা ৩৪ ভাগ, SARS এ ১১ ভাগ, বর্তমান প্যানডেমিক-এ তা এর চাইতে অনেক কম। কেবলমাত্র যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল বা যারা অন্যান্য রোগে ভুগছে তাদেরই মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। ইতালিতে মৃত্যুহার (৫%) গোটা দুনিয়ার (৩.৪%) চেয়ে বেশি কেননা সেখানে বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা বেশি (৬৫-ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা সেখানে মোট জনসংখ্যার ২৩%)।৩ মৃত্যুহার অপেক্ষাকৃত কম হলেও এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। সারা বিশ্বে যেভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন প্যানডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারি দেখা যায়নি। এ কারণে ঝুঁকির মাত্রা, আক্রান্ত দেশ ও রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক অন্যান্য এপিডেমিকের তুলনায় অনেক বেশি। সেকারণেই আক্রান্ত সংখ্যা ও মৃত্যুহার কমানোর উপায় হলো ননথেরাপিউটিক প্রতিরোধ অর্থাৎ মহামারি ব্যবস্থাপনা (আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং, কন্টাক্ট ট্রেসিং)। এর জন্য দরকার সরকার ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকারের মহামারি ব্যবস্থাপনায় কি কি ত্রুটি ছিল বা আছে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থেকেই যায়, তবে আপাতত এই মুহূর্তে সবকিছু ছাপিয়ে দরকার এই নভেল করোনাভাইরাস ঠেকাতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে কাউকে ছাড়বে না, সুতরাং সকলকেই যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন হতে হবে। সরকার সংশ্লিষ্টদেরও বুঝতে হবে তাদের উদ্যোগের গাফিলতি বা ত্রুটি দেশের মানুষের জীবনকেই শুধু হুমকিতে ফেলবে না, যেকোনো ভুল পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলবে। বাংলাদেশের জন্য প্রাথমিকভাবে একটা বড় সংকট হলো করোনা টেস্ট করার সরঞ্জামাদি ও মহামারি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত জনবলের অপ্রতুলতা। গত ১৭ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকায় জানা গেল, বাংলাদেশে আরটি পিসিআর-এর মাধ্যমে করোনা ডিটেকশনের মাত্র ১৭৩২টি কিট আছে। চীন আরো ৫০০ কিট দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এছাড়া সচেতনতার অভাবে উদ্ভুত ভীতি ও আশংকা এবং তার সাথে সাথে নোভেল করোনাভাইরাস সনাক্তকরণ পরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেকক্ষেত্রেই রোগ সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে। আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক খবর হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্যোগে ড. বিজন কুমার শীলের (যিনি এর আগে সার্স ডিটেকশন কিট তৈরিতে যুক্ত ছিলেন) নেতৃত্বে বাংলাদেশে কম খরচে এই নোভেল করোনা ভাইরাস সনাক্তের উপযোগী সেরোলজিকাল কিট তৈরি করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সরকার গণস্বাস্থ্যকে কিট উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে, যদিও এটা কতটা কার্যকর হবে কিংবা কতদিনে মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ দেখা যাবে তার জন্য আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আরটি পিসিআর-এর মাধ্যমে ভাইরাল আরএনএ এম্পলিফিকেশন করে এই ভাইরাস সনাক্ত করা হচ্ছে। এর সমস্যা হলো এই প্রক্রিয়ায় সময় ও অর্থ বেশি লাগে। শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি থাকা অবস্থাতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীকে চিহ্নিত করা সম্ভব। অন্যদিকে এন্টিবডি নির্ভর সেরোলজিকাল টেস্টের মাধ্যমে কম খরচে কম সময়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা যায়, এমনকি যারা সুস্থ হয়ে গেছেন, তারাও কখনো আক্রান্ত হয়েছিলেন কিনা (অর্থাৎ তার শরীরে ভাইরাস প্রতিরোধী এন্টিবডি আছে কিনা) এই পরীক্ষায় তাও জানা সম্ভব। গত ফেব্রুয়ারির শেষে সিঙ্গাপুর সর্বপ্রথম এই ধরনের সেরোলজিকাল কিট আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়।৪ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের Biomerica কোম্পানি করোনার এই ধরনের র্যাপিড টেস্টিং কিট শিপিং করা শুরু করেছে।৫ আরেকটা আশাব্যঞ্জক দিক হলো যে চীনে এই নোভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের সূচনা হয়েছিলো, সেই চীন নোভেল করোনাভাইরাসকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। যে উহান নগরী বা হুবেই প্রদেশ থেকে এই সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, সেখানে সম্প্রতি নতুন সংক্রমণ দেখা যায়নি। শুরুতে চীনকে কার্যত একাই এই বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হয়েছে। চীনে যখন এই ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলো, তখন সাহায্যের বদলে পশ্চিমা রক্ষণশীল মিডিয়ায় উল্টো চীনকে নিয়ে নানা নেতিবাচক খবর প্রকাশিত হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশের রক্ষণশীলদের চীনবিরোধী অপপ্রচার এই মানবিক বিপর্যয়ের সময়েও থামেনি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ‘দি রিয়েল সিক ম্যান ইন এশিয়া’ শিরোনামে চীনকে কটাক্ষ করা হয়েছে, জার্মানির ডার স্পিয়েগেল পত্রিকার কভার পেজে একজন মাস্ক পরিহিত মানুষের ছবি দিয়ে লেখা হয়েছিলো ‘মেইড ইন চায়না’। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে অনেকবার ভাইরাসটিকে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ বলে অভিহিত করেছেন, স্টেট সেক্রেটারি মাইক পম্পেও বলেছেন ‘উহান ভাইরাস’। ভাইরাসকে এভাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে বর্ণবাদ ও জেনোফোবিয়াকে উসকে দেওয়া হয়েছে বলে চীন বারবার অভিযোগ করেছে। এছাড়াও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সার্ভিস বিভাগ থেকে যে করোনা সংক্রান্ত প্রচারের ভেতর এই করোনা ভাইরাসের কারণে এশিয়ান মানুষদের প্রতি জেনোফোবিয়াকে স্বাভাবিক বলে তুলে ধরা হয়েছিল। এই ধরনের উগ্র ডানপন্থি প্রচারের মুখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীনা নাগরিক সহ প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।৬ অথচ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি কোভিড-১৯ আক্রান্ত চীনের পাঁচটি শহর ভ্রমণ করে ১২ জন চীনা ও ১৩ জন বিদেশি বিজ্ঞানীর একটি দল যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে মহামারি ঠেকাতে চীনের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে।৭, ৮ বিজ্ঞানীরা সেখান থেকে ফিরে এসে বলেছেন, চীন এই উদ্যোগগুলো না নিলে গোটা বিশ্বে এই মহামারি আরো ভয়ংকরভাবে ছড়িয়ে পড়ত, এবং চীন গোটা দুনিয়ায় এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বেশ কিছুদিন বিলম্বিত করতে পেরেছে। দশ দিনের মধ্যে একাধিক অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ, ব্যাপক করোনাভাইরাস পরীক্ষা, নজিরবিহীন আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি প্রয়োগ, হাজার হাজার প্রশিক্ষিত কর্মী আক্রান্ত এলাকায় প্রেরণ, মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চীন যেভাবে পদক্ষেপ নিতে পেরেছে, তা নতুন মহামারি মোকাবিলায় এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একেবারে নতুন এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে গোটা বিশ্ব যখন অন্ধকারে ছিলো, তখন চীন নানাভাবে এই ভাইরাস সনাক্তকরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে, ক্রমাগত সেই পদ্ধতির আরো আধুনিকায়ন করেছে। চীনের গবেষকরা ভাইরাসের নমুনাগুলো সংগ্রহ করে এক বিশাল ডাটা সেট তৈরি করেছেন, বিভিন্ন গবেষণা জার্নালে এই সংক্রান্ত গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করছেন। নতুন এই ভাইরাসের জীবনরহস্য উন্মোচন এবং ভাইরাস সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে চীনা বিজ্ঞানীরা গোটা বিশ্বের সাথে শেয়ার করছেন, যা গোটা দুনিয়ায় এই ভাইরাসবিরোধী লড়াইয়ে ভূমিকা রাখছে। কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এই মহামারিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এই বিপর্যয়কালীন সময়ে চীনের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে মেনে নিয়েছে, প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে। আক্রান্ত এলাকায় সকল নাগরিককে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় একদিকে যেমন নজরদারির মধ্যে আনা হয়েছে, অন্যদিকে চীনে কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্রুততার সাথে প্রদেশ, কাউন্টি এমনকি কমিউনিটি লেভেলে শৃঙ্খলার সাথে বাস্তবায়ন করা গেছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুততার সাথে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির স্বেচ্ছাসেবকরাও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গিয়েছেন, জনগণকে সেবা দিয়েছেন, তাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। চীন সরকার দ্রুততম সময়ে দেশব্যাপী ৬ রকমের আরটি পিসিআরের কিট, আইসোথার্মাল এমপ্লিফিকেশন কিট, ভাইরাস সিকোয়োন্সিং কিট এবং ২ ধরনের অ্যান্টিবডি সনাক্তকরণ কিট হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করেছে, সেই সাথে স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই বা প্রাইভেট প্রটেকশন ইক্যুপমেন্টের ব্যবস্থা করেছে। বলা বাহুল্য, চীনের সরকার এই কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের টেস্ট থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ চিকিৎসার ভার বহন করেছে, ফলে চীনের মানুষ কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই রোগ সনাক্তকরণ পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করতে গিয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে কন্টাক্ট ট্রেসিং-এর মাধ্যমে সম্ভাব্য সংক্রমণ বহনকারী প্রায় প্রতিটি মানুষের পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চালু থাকলে বা ধনিক শ্রেণির সরকার ক্ষমতায় থাকলে চীনে এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা ও তাতে জনগণের সমর্থন অর্জন করা সম্ভবপর ছিলো না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। চীন এখন এই মহামারির ধকল সামলে ওঠার চেষ্টা করছে। অস্থায়ী হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। তারা এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন আক্রান্ত দেশে স্বাস্থ্যকর্মী এবং ডিটেকশন কিট দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা মনে করেছিলো এই মহামারিতে কেবল চীনই বিপদে পড়তে যাচ্ছে, অথচ এখন দেখা যাচ্ছে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিই বিপদঘণ্টা শুনছে। বর্তমানে ইউরোপ এই ভাইরাস সংক্রমণের কেন্দ্র বা এপিসেন্টারে পরিণত হওয়ায়, সেখানকার জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ১৮ মার্চ, এক দিনেই ইতালিতে প্রায় ৫০০ মানুষ এই ভাইরাস সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মত তথাকথিত পরাশক্তিদের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অপ্রস্তুত অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। চীন যখন একদম নতুন এক মহামারির সাথে লড়ছে, বিশ্ব পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থিত রাষ্ট্রগুলো তখন প্রস্তুতির সময় পেয়েও নিজেদের নাগরিকদের রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভাব্য যুদ্ধের জুজু দেখিয়ে জনগণের পয়সায় ‘প্রতিরক্ষা’র নামে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও, মহামারি মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতার অভাব প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়েছে। অণুজীববিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগেও ভাইরাসসৃষ্ট মহামারিতে এত এত মানুষের মৃত্যু ও অর্থনীতিতে এত বিশাল প্রভাব প্রমাণ করে মহামারিসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় এই পুঁজিবাদী দুনিয়া সক্ষম নয়। আজকের পুঁজিবাদী দুনিয়ায় একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সকলের সমান সুযোগ নেই, অন্যদিকে এই দুর্যোগের মধ্যেও কিছু ফার্মাসিউটিক্যাল বিগ শটের বড় পরিমাণ মুনাফার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি বেসরকারিখাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, জনস্বাস্থ্যের দিকে রাষ্ট্রের সার্বক্ষণিক নজর যদি না থাকে তাহলে বিপদ যে আরো বাড়ে তা আবার প্রমাণিত হলো। এই মুহূর্তে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের দেশগুলোর মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রথমত, উপযুক্ত মহামারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সৃষ্ট প্যানডেমিককে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা ও এর আরো ছড়িয়ে পড়া রোধ করা। এ ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের কাজে লাগতে পারে। দ্বিতীয়ত, করোনা ভাইরাস সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটকে মোকাবিলা করা। এই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় করোনা ভাইরাসসৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দায় বিশ্বের নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষেরা যে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে তা অনুমান করতে কষ্ট হচ্ছে না। বর্তমানের বিশ্বব্যবস্থায় কর্পোরেটদের স্বার্থের বিপরীতে না গিয়ে অবশ্যম্ভাবী অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা করা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তবে, এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, এই প্যানডেমিক গোটা দুনিয়ার মানুষের জন্য, আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট শিক্ষা হয়ে থাকবে। এই শিক্ষার জন্য গোটা দুনিয়ার মানুষকে কত মূল্য চুকাতে হয় তাই এখন দেখার বিষয়। তথ্যসূত্র: ১. The effects of temperature and relative humidity on the viability of the SARS coronavirus, Chan K Peiris, J Lam S et al., Advances in Virology, 2011 ২. https://papers.ssrn.com/sol3/ papers.cfmabstract_id=3551767 ৩. https:/ww/w.livescience.com/ why-italy-coronavirus-deaths-so-high.html ৪. https://twitter.com/dukenus/ status/1232459030506786816 ৫. https://apnews.com/Globe% 20Newswire/d3558e1662e9a1451d6d0b49cba70dd9?fbclid=IwAR04kasf8vLoKr5f55y-jADF6VkMPObKQtSMU1Xz0hJxsoTNpaMUGkRvy30 ৬. https://en.wikipedia.org/wiki/ Xenophobia_and_racism_related_to_the_2019%E2%80%9320_coronavirus_pandemic ৭. 28 February 2020, Report of the WHO-China Joint Mission on Coronavirus Disease 2019 (COVID-19) ৮. আরো দেখুন– চীন যেভাবে করোনাভাইরাস জয় করলো, নাদিম মাহমুদ, ১১ মার্চ ২০২০, https://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/59890
প্রথম পাতা
করোনাকালে জীবন জীবিকা বাঁচাতে লড়াই গড়ে তোলা সময়ের দাবি
সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবি বাম জোটের
অথর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ; সারাদেশে বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণের দাবি
করোনাভাইরাস: ১০ আগস্ট থেকে সিপিবির ফের প্রচারাভিযান
সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক
বন্যা পরিস্থিতিতে সিপিবির গভীর উদ্বেগ
বানভাসী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসার দাবি ক্ষেতমজুর সমিতির
চীনের ভ্যাকসিন ট্রায়াল বন্ধের চক্রান্তে ক্ষোভ বাম জোটের
কমরেড রতন সেন হত্যার ২৮ বছর
চলে গেলেন কৃষক নেতা আবুল হাশেম, সিপিবি’র শোক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..