আসাদের শেষ লক্ষ্য ইদলিব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ সরকারের সেনাবাহিনী এখন সিরিয়ার প্রায় সব ভূখণ্ড বিদ্রোহীদের হাত থেকে মুক্ত করে ফেলেছে। বাকি রয়েছে শুধু ইদলিব। রুশ বিমান বাহিনীর সমর্থন নিয়ে সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সেনারা গত এপ্রিল থেকে ইদলিবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তীব্র হামলা অভিযান শুরু করে। সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশ হচ্ছে এখন বাশার আসাদ বিরোধী বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ঘাঁটি। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে আল-কায়েদা সমর্থক জিহাদি গোষ্ঠী যেমন আছে, তেমনি আছে তুরস্ক-সমর্থিত বিদ্রোহী। এছাড়া কিছু কুর্দি যোদ্ধাও রয়েছে। ইদলিব প্রদেশটিতে বসবাস প্রায় ৩০ লাখ মানুষের। এদের অনেকে সরকারি বাহিনীর দখলে থাকা বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে গিয়ে জড়ো হয়েছেন। বাশার আসাদের সংকল্প হলো, তিনি ইদলিব দখল করে পুরো সিরিয়াকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করবেন। আর বিদ্রোহীদের সামরিক বাহিনীর এই ধাক্কা সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতায় ফাটল ধরিয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এক চুক্তি অনুসারে, ইদলিবকে ‘ডি-এস্কালেশন জোন’ বা যুদ্ধ-মুক্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হলেও গত ডিসেম্বর থেকে সেখানে সামরিক অভিযান নতুন উদ্যোমে শুরু করেছে সরকার। প্রদেশটির মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রাস্তা এমফাইভ হাইওয়ে দখলে চেষ্টা জোরদার করে সরকারি জোট। আলেপ্পো প্রদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক পরিবহণ ও যোগাযোগে অন্যতম প্রধান রাস্তা এটি। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান উত্তর পশ্চিম সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে অবিলম্বে নতুন করে আক্রমণ চালানোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, অভিযান এখন ‘সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ এরদোয়ানের নির্দেশে তুরস্ক ইদলিবে হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে ইতোমধ্যেই। এরদোয়ান দাবি করছেন তিনি চান ইদলিব প্রদেশের সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে নিরাপদ এলাকায় পরিণত করতে। অথচ সিরিয়ার বিভিন্ন উপকণ্ঠে তুরস্কের হামলায় ইতিমধ্যেই শত শত লোক নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও তাতে এখনো কোনও কাজ হয়নি। এরদোয়ানের সিরিয়া বিষয়ক সম্পৃক্ততার কারণ হলো, সিরিয়ার দশ বছরব্যাপি যুদ্ধের কারণে বিপুল সংখ্যক লোক পালিয়ে তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। তুরস্ক এখন বলছে, তাদের আর নতুন অভিবাসী আশ্রয় দেবার জায়গা নেই। তারা চায়, সিরিয়ায় যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত লোকেরা যেন তুরস্কে না ঢুকে বরং সিরিয়ার ভূখণ্ডের মধ্যেই থাকতে পারে- তার ব্যবস্থা করতে। এদিকে আসাদ সরকারের এমন পদক্ষেপে আলেপ্পোর পশ্চিমাংশ থেকে জোরপূর্বক ঘরছাড়া হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গেছেন ইদলিবে। প্রাণ হারিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক দফায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আলেপ্পো ও ইদলিব থেকে। জাতিসংঘ অনুসারে, এ সংখ্যা অন্তত ৯ লাখ। উপরন্তু, বেসামরিকদের ওপর নির্বিচারে গোলাবর্ষণে খোলা আকাশের নিচে- গাছের নিচে, তুষারে ভরা মাঠে- ঠাঁই গাড়তে বাধ্য হয়েছেন ৮২ হাজার মানুষ। ঠাণ্ডায় জমে মারা যাওয়ার তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে তারা। জাতিসংঘের মানবিক বিষয় সমন্বয়কারী সংস্থা ওসিএইচএ’র হিসাব অনুসারে, নতুন বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারের ৩৬ শতাংশ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছেন বা বাসা ভাড়া নিয়েছেন। ১৭ শতাংশ আশ্রয় পেয়েছেন জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে। অন্তত ১৫ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবনগুলোয় মাথা গুঁজেছেন ও ১২ শতাংশ এখনো আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন। নিজার হামাদি এখনো বিনিশের ওই নির্মাণাধীন স্কুলেই থাকেন। তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর জন্য শিবিরে থাকার বাস্তবতা হচ্ছে মূলত গরমের সময় গাছের নিচে থাকা আর শীতের সময় নাইলনের পাত ও কম্বল দিয়ে তাঁবু বানিয়ে নেয়া। নিজার আরো বলেন, আমার ভাই ও তার পরিবার এমন নির্মম পরিণতির শিকার হওয়ার পরও কোনো মানবাধিকার সংগঠন আমাদের কোনো রসদ বা তাঁবু দেয়নি। প্রায় দুই মাস ধরে এমনটা চলছে। আমাদের সাহায্য দরকার, কিন্তু সহানুভূতি কেবল নতুন পত্রিকার শিরোনামগুলোর জন্যই বরাদ্দ যেন। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। মারা গেছেন কতজন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। জাতিসংঘের হিসাবে ডিসেম্বর থেকে সেখানে কমপক্ষে ৮ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। সিরিয়ার নতুন বাস্তুচ্যুতদের ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। সবচেয়ে বেশি পীড়াও তাদেরই সহ্য করতে হয়। জাতিসংঘের মানবিক বিষয় ও জরুরি ত্রাণ বিষয়ক প্রধান মার্ক লোকক বলেন, সিরিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহতার নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতরা ‘আতঙ্কিত’। শিবিরগুলোয় জায়গা নেই। জমে যাওয়ার মতো তাপমাত্রায় তাদের বাইরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। মায়েরা প্লাস্টিক পুড়িয়ে শিশুদের উষ্ণ রাখার চেষ্টা করছেন। ঠাণ্ডায় নবজাতক ও ছোট শিশুরা মারা যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সিরিয়ায় কাজ করা গবেষক সারা কায়ালি বলেন, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নজিরবিহীন মানবিক সংকট চলছে। একটি বিষয় হচ্ছে, বাস্তুচ্যুতের মাত্রা মানবাধিকার কর্মীদের সামাল দেয়ার সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সহিংসতা- গোলাবর্ষণ, বিমান হামলায় কেবল মানুষ ঘরছাড়াই হচ্ছেন না, তাদের আশ্রয় ও খাদ্য প্রদানের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..