পরিকল্পিত নৈরাজ্যের শিকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : বাম গণতান্ত্রিক জোট কর্তৃক গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট -উত্তরণের পথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় পঠিত সূচনা বক্তব্য: বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণানুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে গত ১২ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ার বাজারে নীতি নির্ধারকদের দ্বারাই লুটপাট সংগঠিত হয়েছিল। ২০১০ সালেও একই সরকারের আশ্রিত ব্যবসায়ী নেতাদের নেতৃত্বে শেয়ার বাজার লুটপাট সংগঠিত হয়েছে। দেশের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে যে সংকট বিরাজ করছে তার উৎস হচ্ছে দেশের জবাবদিহিতাহীন, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী, লুটপাটের শাসন ব্যবস্থা ও মুক্তবাজারী অর্থনীতি, মন্ত্রী, আমলা, সাংসদ, ব্যাংকারদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও শাসক দলের আশ্রিত ব্যবসায়ী লুটেরা ধনিকদের লুটপাট। বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের চিন্তার সাথে মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের চিন্তার সমন্বয় সাধন করে দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক ডাকাত লুটেরা গোষ্ঠীর কবল থেকে দেশের ব্যাংকসহ আর্থিক খাত ও পুঁজি বাজারকে উদ্ধার করা। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর সংসদে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৯১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুন মাসে ৯ লাখ ৩২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণের মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছিল। বিআইবিএম’র সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন, ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করুন’ প্রবন্ধে হিসেব করে দেখিয়েছেন খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব চাতুরিপূর্ণ। তাঁর মতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১,১২,৪২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের সাথে যুক্ত হবে আদালতের ইনজাংশনের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯,২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেনশন একাউন্টের ২৭,১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূত রিসিডিউলিং করা ২১,৩০৮ কোটি টাকা। সর্বসাকুল্যে ২,৪০,১৬৭ কোটি টাকা। এর সাথে রাইট অফ করা মন্দ ঋণ ৫৪,৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করে হয় ২,৯৪,৬৩০ কোটি টাকা। ৩০ জুন ২০১৯ সালে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৬২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকার বিপরীতে অধ্যাপক মইনুল হোসেনের হিসাব অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২,৯৪,৬৩০ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৩০.৬২%। এ বিশাল খেলাপি ঋণের জন্যে দায়ি সরকারের গণবিরোধী আর্থিক নীতি, সরকার ও ব্যাংক প্রশাসনের অদক্ষতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, জবাবদিহীহীনতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা লুটেরা ধনিক গোষ্ঠী যারা ‘আদি পুঁজি সঞ্চয়নের’ নামে সরকারের সহযোগিতায় সকল নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওভার ইনভয়েস, আন্ডার ইনভয়েস, প্রকল্প ব্যয় অতিরিক্ত দেখিয়ে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। আবার অনেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে হুন্ডি করে দেশ থেকে টাকা পাচার করে চলেছে। সরকারের ছত্রছায়ায় এভাবে লুটেরা ধনিকরা ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিদেশে পাচারকৃত আরাফাত রহমান কোকোর টাকা যখন ফেরত আনা হলো তখন দেশবাসী আশ্বস্ত হয়ে মনে করেছিল যাক, এবার বুঝি দেশ থেকে পাচারকৃত সকল অর্থ ফেরত আনা হবে। কিন্তু হায়! সে আশায় গুড়ে বালি। ওটা ওখানেই থেমে আছে কোন এক অদৃশ্য কারণে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর তাদের তথাকথিত ‘দিন বদলে’র কর্মসূচির অন্যতম রচয়িতা একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবলিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক চাপে বা অন্য যে কোনও কারণে হোক সেসময় বেসরকারি ব্যাংকসমূহে মন্দ ও খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের অনেক গুলোই সেই ব্যাংক টেকওভার করেছিল। বর্তমানে সেই ঋণসমূহ পুনরায় মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। যার পরিমাণ সাড়ে ৪/৫ হাজার কোটি টাকার নীচে হবে না। এটা ব্যাংক প্রশাসনের জবাবদিহীহীনতা ও অদক্ষতারও পরিচয় বহন করে। ওয়াকিবহাল মহল জানেন পাবলিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পেতে গেলে পরিচালক-ব্যাংকার সিন্ডিকেটকে ঋণের ৭% থেকে ১০% টাকা ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সংখ্যায় সম্পাদক নঈম নিজাম এক সাংসদকে উদ্ধৃত করে স্বনামে উপসম্পাদকীয় লিখেছেন, সাংসদ কোনো একটা ব্যাংক থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণ চাইলে তাকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সাংসদ তার সহজামানতের সীমাবদ্ধতার কথা জানালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০ কোটি টাকার বিপরীতে দেয়া সহজামানতের ডকুমেন্টকে ২০০ কোটি টাকা ঋণের উপযুক্ত করে দেয়ার কথা বলেন। ব্যাংক চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্য, ‘কাগজপত্র নিয়ে চিন্তা নেই। প্রয়োজনে অন্য নামে নিন। আপনার নামেও নেয়ার দরকার নেই। দরকার হলে কাগজপত্র আমরা বানিয়ে নেব। তবে আমাদের একটা প্রস্তাব শুধু শুনতে হবে। ১০% দিয়ে দিতে হবে। হংকং চলে যাবে এই ১০%। আপনার টাকা দেশে রাখবেন না বিদেশে পাঠাবেন সেটা আপনার বিষয়।’ এ হচ্ছে সরকারের নিযুক্ত চেয়ারম্যান সাহেবের চরিত্র আর মেরুদণ্ডহীন বশংবদ ব্যাংক কর্মকর্তার লুটপাটে সহায়তা করার চিত্র। জনাব নঈম নিজাম কোন ব্যাংক, কোন সাংসদ, কোন চেয়ারম্যানের কথা বলেছেন আমরা জানি না। তবে এমন চেয়ারম্যান কি আমরা দেখিনি? এ সরকার আমলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু দানছত্র খুলে ৪/৫ হাজার কোটি টাকা দলীয় স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন। যার পুরোটাই খেলাপি হয়ে গেছে। বেসিক ব্যাংকের শক্তিশালী অবস্থান নষ্ট করে দিয়েছেন রাজনৈতিক ও আত্মীয়তার বিবেচনায় নিযুক্ত হওয়া ব্যক্তিটি। সোনালী ব্যাংকের সরকার মনোনীত আওয়ামী লীগ নেতা পরিচালকদের সহযোগিতায় হলমার্ক নামক একটা কোম্পানি ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর দায়িত্ব কার? এর দায়িত্ব নিতে হবে সরকার, অর্থমন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের। হলমার্ক কেলেংকারির সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, ৪ হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। পরবর্তীতে সংসদ ও অন্যত্র আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে অর্থহীন বিষোদগারও করেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী। সাম্প্রতিককালে সেই অসৎ লুটেরা চেয়ারম্যানের পক্ষ নিয়েছে দুদক চেয়ারম্যান। সর্ষের মধ্যেই ভূত। এছাড়াও এই সরকারের আমলেই বিসমিল্লাহ, ক্রিসেন্ট, এননটেক্স প্রভৃতি আর্থিক কেলেংকারিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে এক বিলিয়ন ডলার চুরি হয়ে যাওয়ার কথা দেশবাসী জানে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে দুইবার লুটপাট সংগঠিত হয়েছে। দুই বারই আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজার লুটপাটের সাথে জড়িত ছিল সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ। কিন্তু ২০১০ সালের লুটপাটের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছিল আওয়ামী সরকার ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী। সমগ্র ২০১০ সাল জুড়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার চালানো হয়েছে দেশের আর্থিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন পুঁজিবাজারকে সম্প্রসারিত করা। সে কারণে আর্থিক খাত থেকে অর্থ পুঁজিবাজারে স্থানান্তরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জেলায় জেলায় রোড শো করা হয়। জেলায়, উপজেলায় ব্রোকার হাউজের শাখা খোলার অনুমতি দেয়া হয়। সরকার ব্যাংক আমানতের সুদ কমিয়ে দিয়েছিল। সঞ্চয়পত্রের সুদ ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছিল। একদিকে সরকারি প্রচারণা অন্যদিকে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের সুদ কমে যাওয়া, পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক অবস্থায় অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের ঘটনায় শেয়ার বাজার সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়াই তরুণ-যুবকসহ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিল। বছর শেষ না হতেই ২০১০ সালের ডিসেম্বরে এক দল দুর্বৃত্ত পাশের দেশের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় হাজার হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে লুটে নেয়। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট আজও জনসম্মুক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। দোষীদের শাস্তি তো দূরের কথা। পুঁজিবাজারে একদল লোক সর্বস্বান্ত হলেও, গুটি কয়েক মানুষ ফুলে ফেঁপে উঠেছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধামন্ত্রীর বর্তমান উপদেষ্টা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা সালমান রহমান সাহেব। তিনি পুঁজিবাজারের অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন। পুঁজিবাজারের টাকা দিয়েই নাকি তিনি তার সে সময়ের সব খেলাপি ঋণ পরিশোধ করেছিলেন। ২০১০ সালের পর পুঁজিবাজার আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের আর্থিক ও পুঁজিবাজারের বর্তমান হালচাল। বর্তমান সরকার এবার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ীদের মন্ত্রীসভায় স্থান দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী সবাই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী কাম অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পর যে নীতিসমূহ নিয়েছেন সেগুলো দেশের আর্থিক খাত ও ব্যবস্থাকে অধঃপতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত কোনটাই ভাল নেই। আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে যে সকল নীতি তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো- ১) অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল সাহেব চেয়ারে বসেই খেলাপি ঋণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান সার্কুলার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন। ঋণের শ্রেণিকরণের সংজ্ঞা ও মেয়াদ পরিবর্তন করে দেন। (ক) পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের তিন মাস পর যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হত সেগুলোকে ‘সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণ’ শ্রেণিকরণ করা হতো, নূতন নিয়মে তিন মাসের পরিবর্তে সময়টা ছয় মাস করা হয়েছে; (খ) পূর্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের ছয় মাসের বেশি যেসব ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ হত সেগুলোকে ‘ডাউটফুল ঋণ’ বলা হত, নূতন নিয়মে নয় মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলে ‘ডাউটফুল’ শ্রেণিকরণ হবে; এবং (গ) আগের নিয়মে নয় মাসের বেশি কোনো ঋণ খেলাপি হলে ‘মন্দঋণ’ শ্রেণিকরণ করা হতো, এখন এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্যে ঋণ অনাদায়ী হলে ‘মন্দঋণ’ বা ‘ব্যাড এন্ড লস’ শ্রেণিকরণ করা হবে। ২) আগে পাঁচ বছরের খেলাপি মন্দ ঋণ রাইট অফ করার যোগ্য বিবেচিত হতো। বর্তমানে ২/৩ বছর হলেই রাইট অফ করার জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে। ৩) মাত্র ২% খেলাপি ঋণ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে দিলে ঋণ খেলাপিকে তিন মাসের কিস্তিতে মাত্র ৯% সুদে বাকি ঋণ ১০ বছর সময়ে শোধ করার সুযোগ দেয়া হবে। ৪) অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন কার্যকর করার মাধ্যমে ঋণ খেলাপিদেরকে মাফ করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ৫) পরিবারতন্ত্রের স্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। সংশোধনী অনুযায়ী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবার থেকে দুই জনের পরিবর্তে চার জনকে নিযুক্ত করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। একজন পরিচালক একাদিক্রমে ৬ বছরের পরিবর্তে একাদিক্রমে ৯ বছর পরিচালক থাকার বিধান রাখা হয়েছে। ৬) বর্তমানে চট্টগ্রামের একটি ব্যবসায়ি গোষ্ঠীর মালিকানায় রয়েছে ৮টি বেসরকারি ব্যাংক। ব্যাংকসমূহে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়েছে ও হচ্ছে। ৭) অর্থমন্ত্রী সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদানের বিল সংসদে পাস করিয়েছেন। ৬১টি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি তহবিলে স্থানান্তর করা হবে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ যা বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহে জমা রয়েছে তা যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয় তাহলে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ তারল্য সংকটে পড়বে। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যে নৈরাজ্য চলছে তা থেকে মুক্তি পেতে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের জন্যে আমরা নিম্নলিখিত সুপারিশসমূহ তুলে ধরছি- ১) ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। ২) ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগসমূহ নিস্পত্তির লক্ষ্যে ব্যাংক খাতের জন্য স্বতন্ত্র ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। ৩) মন্দঋণ আদায়ের জন্য ‘ডেট রিকভারি এজেন্সি’ বা ‘এসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন করতে হবে। ৪) অর্থ ঋণ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে কোনও ঋণ খেলাপির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় হলে সহজামানত নিলাম করার জন্য পুনরায় মামলা করার নিয়ম বাতিল করে সরাসরি নিলাম করার বিধান চালু করতে হবে। ৫) খেলাপিদের ভিআইপি/ সিআইপি মর্যাদা বাতিল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রতিমাসে গণমাধ্যমে ঋণ খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। ৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের খবরদারি রহিত করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তুলে দিতে হবে। ৭) একীভূতকরণের মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে এনে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। ৮) পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার থেকে পুঁজি সংগ্রহে উৎসাহী করতে হবে। ৯) ব্যাংক পরিচালকদের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে। ১০) দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। ১১) ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন এবিবি’র নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ১৩) ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, গতিশীলতা নিশ্চিত করতে ‘স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন’ গঠন করতে হবে। ১৪) বিদেশে পাচারকৃত সকল সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এক পরিকল্পিত নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে চলছে। রাজনীতিকে উপরিকাঠামো হিসেবে দেখা যায় কিন্তু যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না অথচ যার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত তা হল অর্থনীতি। তাই বলা হয় অর্থনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই অর্থনীতিতে ঝাঁকুনি লাগলে তার প্রভাব রাজনীতিতে পড়ে ব্যাপকভাবে। অর্থনীতিতে লুণ্ঠন আর রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনা দেখতে দেখতে কেউ কেউ ভাবছেন এর কি কোনও শেষ নেই। কিন্তু আমরা জানি যে কোনও কিছুর শেষ করতে হলেও তো শুরু করতে হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যে কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে সেখান থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নাই।
প্রথম পাতা
করোনা: চীনের অভিজ্ঞতা ও বিশ্ব পুঁজিবাদের ব্যর্থতা
দেশে একজনের মৃত্যু, আরেকজন ‘আশঙ্কাজনক’
শ্রমজীবী-শিক্ষার্থীদের স্যানিটাইজার দিচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন
মাস্কও বানাচ্ছে যুব ইউনিয়ন
ফাঁসির আরো কাছে যুদ্ধাপরাধী আজহার
লড়াই-সংগ্রামকে বেগবান করে মেহনতি মানুষের সরকার গড়বো
মহাবিপর্যয়ে সরকারের নিস্পৃহতা দায়িত্বহীনতায় সিপিবির ক্ষোভ
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
সব হিসাব আছে শুধু শ্রমিকের জীবনেরটা নেই
‘বাগাড়ম্বর পরিহার করে ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়ান’
সাংবাদিক নির্যাতন গুমের বিরুদ্ধে দরকার গণপ্রতিরোধ
‘চাই জনগণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা’
করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন গণস্বাস্থ্য’র
‘উল্টো রথে’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..