আর্থিক খাতে রাহুর গ্রাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমেদ মিঠু : দেশের আর্থিক খাতে রাহুর গ্রাস ভর করেছে। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার- সর্বত্রই চলছে দেদারসে লুটপাট। এক দশক ধরে দফায় দফায় লুটে নেয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা। রাতের আঁধারে সিঁদ কেটে চুরি নয়, অনেকটা প্রকাশ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে লুটেরাগোষ্ঠী। প্রতিটি ক্ষেত্রে লুটপাটকারীদের চেহারা উন্মোচিত হলেও বলতে গেলে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না সরকার। কারণ এরা ক্ষমতা কাঠামোর শক্তিশালী অংশীদার। হয় সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের লোক, না হয় দলের তহবিল যোগানদাতা। ফলে শাস্তির পরিবর্তে নানা কৌশলে লুটপাটের নতুন নতুন পথ তৈরি করে দিয়েছে সরকার। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে লুটপাটের মহোৎসবে মেতেছে ডাকাতের দল। বিপুল পরিমাণ খেলাপী ঋণের কারণে দীর্ঘকাল ধরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। এই খাতকে সমস্যামুক্ত করতে ঋণ আদায়ে খেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি ছিল। তা না করে উল্টো নতুন করে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পুরনো ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা দূর না করে নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মূল যোগ্যতা দলীয় লোক হওয়া। মূলত অবৈধ উপায়ে আয় করা বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরির জন্য অনেকে ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েছেন। সরকারও এসব অর্থের উৎস জানতে চায়নি। কালো টাকায় ব্যাংকের মালিক হয়ে এদের অনেকেই পুরো ব্যাংক গ্রাস করে ফেলেছে। ব্যাংক লুটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নজির তৈরি করেছে ফারমার্স ব্যাংকের মালিকরা। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীরকে এই ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছিল সরকার। কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যাংকটি থেকে কমপক্ষে দেড় হাজার কোটি টাকা লুটে নেয় পরিচালকরা। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে নাম পরিবর্তন করে ব্যাংকটিকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর এজন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ যোগান দিয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। জনগণের টাকায় ব্যাংকটিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলেও ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন সরকারি দলের অনুগতরা। ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের আরেক নজির বেসিক ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে লাভজনকভাবেই চলছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানার এই ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এরশাদ আমলের সাংসদ আবদুল হাই বাচ্চুকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে বসায়। এরপর থেকেই ঋণের নামে চলতে থাকে মহালুটপাট। বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি বাচ্চুর আশির্বাদপুষ্টরা। ফলে ব্যাংকটির দেয়া মোট ১৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৭ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকাই এখন খেলাপী। লাভের পরিবর্তে সর্বশেষ বছরে এই ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭৫৬ কোটি টাকা। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই বার বার বলেছেন, বেসিক ব্যাংককে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায় আবদুল হাই বাচ্চুর। কিন্তু এই ব্যক্তির টিকিটিও স্পর্শ করেনি সরকার। ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক মামলা করলেও কোনো মামলায়ই নাম নেই বাচ্চুর। এভাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের ঘটেছে লুটপাটের ঘটনা। হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের নামে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হলেও তা আর ফেরত আসেনি। একের পর এক ঋণ অনিয়মের কারণে ধ্বংসের দ্বারে পৌঁছেছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক। কৃষি, বিডিবিএল এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এবি ব্যাংক থেকে সিঙ্গাপুরে পাচার হয়ে গেছে ২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। ঋণ অনিয়মে ভয়াবহ অবস্থা আইসিবি ইসলামি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের। এ দু’টি ব্যাংকে ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ ঋণই খেলাপী। নাজুক অবস্থায় পড়েছে ইউসিবিএল, ন্যাশনাল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। কোনো কোনো ব্যাংক আমানতের চেয়েও বেশি ঋণ দিয়ে রেখেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে খেলাপী ঋণের পরিমাণ। মাত্র দু’বছর আগে সর্বমোট খেলাপী ঋণ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপী ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অবলোপন করে খেলাপী হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে আরো ৪০ হাজার কোটি টাকা। অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যেই ডুবে গেছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং। অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩৫৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন কয়েক জন উদ্যোক্তা পরিচালক। এরপর নানা কায়দায় দাম বাড়িয়ে পুঁজিবাজারে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন তারা। এক পর্যায়ে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে পিপলস লিজিং। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে বিলুপ্ত (অবসায়ন) করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের শাস্তি না দিয়ে প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির এই প্রক্রিয়াকে দুর্নীতির চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় ব্যাংক খাত বাঁচানোর পাশাপাশি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এসব কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যাংক মালিক, ব্যাংকার ও ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া ছিল সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য। কিন্তু লুট হয়ে যাওয়া টাকা উদ্ধার এবং লুটেরাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পরিবর্তে বার বার এদের পুরষ্কৃত করেছে সরকার। নজিরবিহীনভাবে বিতর্কিত ব্যাংক মালিকদের দাবির মুখে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে তাদের জন্য উদার হস্তে নানা সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এক পরিবার থেকে দু’জনের পরিবর্তে চারজন পরিচালক নিয়োগ এবং পরিচালকের মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে নয় বছর করা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ সুবিধায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিলের সুবিধা দিয়েছে সরকার। কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। যেখানে পুরো টাকা মেরে দিলেও কোনো শাস্তি হয় না- সেখানে কে-ইবা ২ শতাংশ ঋণ পরিশোধ করতে যাবে। ফলে এই সুবিধা নিয়ে নিয়মিত হয়েছে খেলাপী ঋণের মাত্র ১৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে ধারাবাহিকভাবে চলছে লুটপাটের খেলা। মাঝেমধ্যেই কৃত্রিমভাবে বাজার চাঙ্গা করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হয়। লাভের আশায় তারা বেশি দামে শেয়ার কেনেন। এরপরই ধ্বসে পড়ে বাজার। বার বার একই কায়দায় বিপুল পরিমাণ টাকা লুটে নিয়েছে শেয়ারবাজারের জুয়াড়িরা। ২০১০ সালে মহাধ্বসের পর থেকে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি বেশ কয়েক জন লুটেরাকে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। ফলে নতুন উদ্যোমে বাজার থেকে অর্থ লুটে নিচ্ছে তারা। দশকের পর দশক ধরে আর্থিক খাতে চলে আসা ধারাবাহিক অনিয়ম লুটপাটের কি কোনো সমাধান নেই? দিনে দিনে বেড়ে চলা খেলাপী ঋণ, দুর্নীতি আর অনিয়মের ভয়াবহ চিত্রই প্রমাণ করে, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া রাহুর গ্রাস থেকে কোনো খাতই মুক্তি পাবে না।
প্রথম পাতা
করোনা: চীনের অভিজ্ঞতা ও বিশ্ব পুঁজিবাদের ব্যর্থতা
দেশে একজনের মৃত্যু, আরেকজন ‘আশঙ্কাজনক’
শ্রমজীবী-শিক্ষার্থীদের স্যানিটাইজার দিচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন
মাস্কও বানাচ্ছে যুব ইউনিয়ন
ফাঁসির আরো কাছে যুদ্ধাপরাধী আজহার
লড়াই-সংগ্রামকে বেগবান করে মেহনতি মানুষের সরকার গড়বো
মহাবিপর্যয়ে সরকারের নিস্পৃহতা দায়িত্বহীনতায় সিপিবির ক্ষোভ
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
সব হিসাব আছে শুধু শ্রমিকের জীবনেরটা নেই
‘বাগাড়ম্বর পরিহার করে ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়ান’
সাংবাদিক নির্যাতন গুমের বিরুদ্ধে দরকার গণপ্রতিরোধ
‘চাই জনগণ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা’
করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন গণস্বাস্থ্য’র
‘উল্টো রথে’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..