নারী জাগরণের অগ্রদূত পণ্ডিতা রমাবাঈ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা ফিচার : ভারতের মহারাষ্ট্র নামক রাজ্যের গুণমলের অরণ্যে পণ্ডিতা রমাবাঈ জন্মগ্রহণ করেন। রমাবাঈয়ের পিতা অনন্ত শাস্ত্রী একজন শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির একজন সমাজ সংস্কারক। তখন নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। রমাবাঈ-এর পিতা অনন্ত শাস্ত্রী তার বালিকা বধূকে শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেয়ায় তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের রোষানলে নিপতিত হন। এই সময় অনন্ত শাস্ত্রী গ্রাম ছেড়ে বনাঞ্চলে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এই নির্বাসিত জীবনে গুণমলের অরণ্যে জন্মগ্রহণ করেন পণ্ডিতা রমাবাঈ। ১৯৭৭ সালের দুর্ভিক্ষে রমাবাঈয়ের পিতা ও মাতা লক্ষ্মীবাঈ উভয়েই মারা যান। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর রমাবাঈ ও তার ভাইকে নিয়ে পিতার পথ ধরেন। নারীশিক্ষা প্রসারের কাজে অগ্রসর হন। তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা। রমাবাঈয়ের স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ে স্বচ্ছতা এবং এ বিষয়ে আলোচনায় যে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তা কলকাতার সুধী শিক্ষিত মহলকে আকৃষ্ট করে এবং তারা তাকে কলকাতায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তার পান্ডিত্যে অভিভূত হয়ে সুধী সমাজ এর স্বীকৃতি জানিয়ে তাকে ‘স্বরস্বতী’ উপাধি দিয়ে ভূষিত করেন। সে সময়ে সরস্বতী ছিল সর্বোচ্চ উপাধি। তখন থেকেই তাকে ‘পণ্ডিতা রমাবাঈ’ বলে সম্বোধন করা হয়। রমাবাঈয়ের ভাইয়ের মৃত্যুর পর বিপিন বিহারী মেদভী নামে এক বাঙালি আইনজীবীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বিপিন বিহারী জাতিতে ছিলেন শূদ্র, একজন ব্রাহ্মণ কন্যা হয়ে নিচু জাতের লোককে বিয়ে করা ছিল তৎকালীন সমাজে রীতিমত ধর্মবিরুদ্ধ কাজ। ওই সমাজে এমন অসম বিয়ে করে তিনি তার কুসংস্কারমুক্ত সাংস্কৃতিক এবং অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। বিয়ের পর তিনি ও তার স্বামী বিপিন বিহারী মেদভী বিধবাদের জন্য স্কুল চালু করার চিন্তা-ভাবনা করেন। তৎকালীন সমাজে স্ত্রী শিক্ষাও ধর্ম বিরুদ্ধ বলে বিবেচিত হতো। স্বামীর মৃত্যুর পর রমাবাঈ কলকাতা ছেড়ে পুনায় চলে যান। সেখানে ‘আর্য মহিলা সমাজ’ নামে এক সংগঠন গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৮২ সালে শিক্ষা বিষয়ে একটি কমিশন গঠিত হয়। রমাবাঈ এই কমিশনের কাছে, শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মহিলা স্কুল ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা এবং নারীদের চিকিৎসার জন্য মহিলা ডাক্তার প্রয়োজন, তাই মেডিকেল কলেজে মেয়েদের ভর্তি হবার সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ পেশ করেন। এই সুপারিশ তৎকালীন সময় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে লেডি ডাফরিন মেয়েদের মেডিকেল শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়ার আন্দোলন করেন। ১৮৮৩ সালে রমাবাঈ শিক্ষক হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইপিসকোপালিয়ান চার্চে যোগ দেন। এই চার্চের আমন্ত্রণে রমাবাঈ ১৮৮৬ সালে শিক্ষা লাভের জন্য আমেরিকা গমন করেন। আমেরিকা থেকে ফিরে এসে বম্বেতে তিনি মহারাষ্ট্রের প্রথম কিশোরী বিধবাদের জন্য স্কুল ও হোস্টেল ‘সারদা সদন’ চালু করেন ১৮৮৯ সালে। পরবর্তীতে তিনি এই সদন বম্বে থেকে পুনায় স্থানান্তরিত করেন এবং সদনের নামে একটি ট্রাষ্টও গঠন করেন। এসময় তিনি আশ্রিতাদের অর্থকরী জীবিকার জন্য জমি ক্রয় করে ‘মুক্তি সদন ফার্ম’ গড়ে তোলেন। এখানে একটি স্কুলে একত্রে ৪০০ ছাত্রীকে শিক্ষা দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। ১৯০০ সালের দুর্ভিক্ষের সময় রমাবাঈয়ের নেতৃত্বে কয়েকশত দুর্ভিক্ষপীড়িত নারী আশ্রয় পায়। পণ্ডিতা রমাবাঈয়ের সংগ্রাম শুধুমাত্র নারীশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিল তার দৃঢ় পদচারণা। তিনি ভারতীয় শ্রমিকদের দুদর্শার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য জনসভা করেন। পরে ভাইসরয় ও তার স্ত্রীকে এই বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে লিখিত প্রস্তাব পাঠান। ১৯০৪ সালে ভারত মহিলা পরিষদের প্রথম সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯০৮ সালে সুরাটে, ১৯১২ সালে বোম্বেতে এবং ১৯২০ সালে সোলাপুরে ভারত মহিলা পরিষদের অধিবেশনগুলোতেও সভাপতিত্ব করেন। ভারতের নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলনের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ ছয় বছর নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার পর ১৯২৩ সালে বোম্বেতে নারীদের ভোটাধিকার অর্জিত হয়। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত রমাবাঈ বোম্বাই সেবা সদনের সভানেত্রী ছিলেন। তারই প্রচেষ্টায় সেবা সদনের অশ্রিতাদের চিকিৎসা বিষয়ে সেবাদানের সুবিধার ১৯১১ সালে ডেভিড সাসুন হাসপাতালে নার্সিং ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার উদ্যোগে ছাত্রীদের জন্য বোর্ডিং হাউসও চালু হয়। পরবর্তীতে এই সেবা সদনে শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্লাস, পাবলিক স্কুল, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিকেল সার্ভিস এবং ইন্ডাস্ট্রি, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, স্পোকেন ইংলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। শ্রমিক নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। কোলনীর শ্রমিকদের ওপর যখন শাসক শ্রেণিরা অত্যাচার করেছিল তখন তিনি তার প্রতিবাদে জনসমাবেশ করে সরকারকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, ‘জনগণ যেমন সরকারের নিকট বাধ্য তেমনি সরকারেরও জনগণের নিকট দায়িত্ব পালনে, তাদের অধিকার পূরণে বাধ্য থাকা উচিত। লেখিকা হিসেবেও রমাবাঈ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পুরুষতান্ত্রিক ও কুসংকারাচ্ছন্ন এই সমাজ মেধা, মনন, পরিশ্রম ও সাহসিকতা দিয়ে যুগে যুগে যেসব নারীরা আজকের অবস্থান তৈরি করেন। নারীর তথা সমাজের অগ্রযাত্রাকে করেছেন গতিশীল, পণ্ডিতা রমাবাঈ তাদের মধ্যে একজন। পন্ডিতা রমাবাঈয়ের সংগ্রামী ইতিহাস যুগে যুগে নারীর অগ্রযাত্রাকে আরো প্রেরণা ও উৎসাহ যোগাবে। নারীর পদযাত্রাকে করবে দৃঢ়। ১৯২৪ সালে এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুবরণের মধ্য দিয়ে তার সংগ্রামী ও কর্মমুখর জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..