ভাষা আন্দোলনে নারীর অবদান

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ইরাবতী তটিনী : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই শ্লোগান এবং এই আন্দোলনে বাংলার নারীরা যে পুরুষের সহযোদ্ধা হয়ে সমানভাবে অংশগ্রহণ করেছেন- এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে মহান ভাষা আন্দোলনে নারীর উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলেও ভাষাসৈনিকদের তালিকায় নারীর অবদান সেভাবে উঠে আসেনি ইতিহাসের পাতায়! যার জন্য ভাষাসৈনিক নারীদের অবদান বাংলার সিংহভাগ মানুষের কাছে অজানা। বিষয়টা দুঃখজনক এবং হতাশারও বটে। অথচ মায়ের মুখের ভাষা রক্ষা করতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও রয়েছে অসামান্য অবদান। বাংলার সর্বস্তরের জনগণের কাছে যে ইতিহাস জ্বলজ্বল করে জ্বলছে চোখের সামনে; সেদিনের পুলিশ আর্মিদের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফির, শফিক, জব্বার, বরকতসহ নাম না জানা অসংখ্য ভাষাসৈনিক। কিন্তু সেইদিন পাকিস্তানি আর্মি ও পুলিশের তাক করা বন্দুকের নল উপেক্ষা করে ভাষার দাবি নিয়ে রাজপথে নামা মিছিলগুলোতে নারীরা ছিলো সামনের সারিতে! ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নারীরাই সর্বপ্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সাহস দেখান। তৎকালীন দৈনিক আজাদসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদে ভাষাসৈনিক নারীদের স্মৃতিচারণ এবং দলিল দস্তাবেজে ভাষা আন্দোলনে নারীদের ভূমিকার চিত্র ভেসে ওঠে। নারীদের ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলে। ধাপে ধাপে মিছিল মিটিং এবং সভা-সমাবেশে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে অসংখ্য নারী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। পুলিশের টিয়ারসেল, লাঠিচার্জ এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মুখোমুখি হন ভাষাসৈনিক অসংখ্য নারী। মিছিল, মিটিং, পোস্টারিং থেকে শুরু করে পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতারও হতে হয়েছে নারীদের; বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবিতে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা একটি দিন। আর এই দিনে পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যা ও নারী নিপীড়নের প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য আনোয়ারা খাতুন ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিধান পরিষদে বলেন-“মিস্টার স্পিকার! ঘটনা দেখে মনে হয় আসলে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা পাইনি। তার প্রমাণ এ পুলিশি জুলুম। পুলিশ, আর্মির অত্যাচার থেকে আমাদের মেয়েরা পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। যে জাতি মাতৃজাতির সম্মান দিতে জানে না সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য।” ৫০-এর দশকে বাংলার নারীরা ছিলো অনেকটা শৃঙ্খলিত, তবুও তারা রক্ষণশীল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার দাবিতে গৃহ ছেড়ে রাজপথে নেমে আসেন সমান তালে মিছিলে, মিটিংয়ে। রক্তক্ষয়ী এই আন্দোলনে সংগ্রামে সভা-সমাবেশে সমান তালে সোচ্চার ছিলেন বাংলার ভাষাকন্যারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতের অন্ধকারে ভাষার দাবি নিয়ে মিছিলে যাওয়ার প্রস্তুতিপূর্ব বিভিন্ন শ্লোগান সম্বলিত পোস্টার তৈরি করতো, আর দিনের আলো ফুটলেই সেসব পোস্টার নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে ভাষার দাবি সম্বলিত স্লোগান ধরতো, নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিল নিয়ে বের হতো। পাকিস্তানী মিলিটারিরা ছাত্রীদের গ্রেপ্তার করে, গাড়ি করে কুর্মিটোলায় নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে যারা মারাত্মক আহত হয়েছেন তাদের একজন হলেন ঢাকা হাইকোর্টের জাস্টিস ইব্রাহিম সাহেবের মেয়ে মিস সুফিয়া ইব্রাহিম। আর একজন মিস রওশন। ভাষাসৈনিকরা কয়েকটি প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করেন। সেগুলো হচ্ছে- (১) ভাষা আন্দোলন সূত্রে বন্দি ব্যক্তিদের শর্তহীন মুক্তি (২) হতাহতদের ক্ষতিপূরণ (৩) হত্যা, নির্যাতন ও অপকর্মের জন্য দায়ী অফিসারদের প্রকাশ্য বিচার (৪) সরকারের কোনো শাস্তি গ্রহণ না করা। মাতৃভাষা বাংলার দাবি ওঠে সর্বপ্রথম ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর থেকেই। এবং ভাষা আন্দোলনে নারী সমাজের অবদানের কথা বলতে হলে শুরু থেকেই নারীরা বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা করার আন্দোলনে ছিলো সোচ্চার। ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার অনুরোধ সম্বলিত একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আর সেই স্মারকলিপিতে বরেণ্য ব্যক্তিদের সাথে স্বাক্ষর করেছিলেন ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সম্পাদিকা লীলা রায় এবং মিসেস আনোয়ার চৌধুরী। সিলেট জেলার নারীদের পক্ষ থেকে তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব নিশতারের কাছে সিলেটের রাজকীয় বালিকা বিদ্যালয়ে ১৯৪৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন মহিলা মুসলিম লীগের জেলা কমিটির সভানেত্রী জোবেদা খানম, সহকারী সভানেত্রী সৈয়দা শাহের বানু চৌধুরী, সম্পাদিকা লুৎফুন্নেসা খাতুন, রাবেয়া খাতুন, জাহানারা মতিন, রোকেয়া বেগম, সামসি কাইসার রশীদ, নুরজাহান বেগম, সুফিয়া খাতুন, মাহমুদা খাতুন প্রমুখ। বগুড়ার কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় বাংলা ভাষা সংগ্রাম কমিটি। এতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন রহিমা খাতুন ও সালেহা খাতুন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সকল দাবি নাকচ করে দিলে বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। ১১ মার্চ ডাকা হলো সাধারণ ধর্মঘট। আর এখানেও সম্পৃক্ত ছিলেন জাগ্রত নারীসমাজ। যাদের মধ্যে অন্যতম নিবেদিতা নাগ, নাদেরা বেগম, লিলির খান, লায়লা সামাদ প্রমুখ। আর সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য গ্রেফতার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়ুয়া ছাত্রী নাদেরা বেগম। বরিশালের বিএম কলেজের ছাত্রী রওশন আরা বাচ্চু এসময় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ধর্মঘট, সভা ও মিছিল করেন। ওইসময়ে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বাইরে বের হওয়া নিষেধ থাকলেও তিনি রাজপথে অন্যান্য ছাত্রীদের সাথে নেতৃত্বে ছিলেন। যশোরে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। ওইদিন হরতাল ডাকা হলে যশোরের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসাবে পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বি.এ পড়ুয়া ছাত্রী হামিদা রহমান। সে-সময় প্রায় প্রত্যেক স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা ধর্মঘটে যোগ দিলেও শোমিন গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থীদের স্কুল কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞায় মিছিলে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু হামিদা রহমান তার দৃঢ় নেতৃত্বে ওদের বের করে নিয়ে আসেন। আর এই ধর্মঘটের মিছিলে নেতৃত্বের কারণে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। কিন্তু এরপরেও তিনি সভায় যোগ দেন এবং সভাশেষে শাড়ি বদলে পায়জামা শার্ট পরে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কলেজের পেছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। ভাবা যায়! সেই সময়ে কতটা সাহসী হলে দেশপ্রেমকে লালন করে ধারণ করে যশোরের এক সাহসী মেয়ের পক্ষে রাজপথে নেমে আসা যায়। বাগেরহাট কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী হালিমা খাতুন, রাবেয়া বেগম, সেলিমা খাতুনসহ অনেক ছাত্রী সে সময়ে ছাত্রদের সাথে থেকে পুরো শহরে পিকেটিং করেন। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ কর্তৃক আয়োজিত প্রথম সম্মেলনে নেতৃত্বে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকার করিয়ে নেওয়ার জন্য আবশ্যক হলে মেয়েরা রক্তবিন্দু পর্যন্ত বিসর্জন দেবে।’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা নাগাদ হাজারো ছাত্রছাত্রীর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-স্লোগানে মুখরিত চারদিক। এ সময়ে তিনবছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করে মুক্তি পেয়েই ভাষা আন্দোলনে আবারো সক্রিয় হলেন নাদেরা বেগম। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে সিদ্ধান্ত হলে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সভাপতিত্বে মিছিল বের হতে শুরু করে। প্রথম মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন হাবিবুর রহমান এবং চতুর্থ মিছিলের চার লাইনে চারজন করে অংশগ্রহণে রাজপথে নেমে আসেন মেয়েরা। সাদিয়ার নেতৃত্বে সুফিয়া ইব্রাহীম, রওশন আরা বাচ্চু, হালিমা খাতুন, নাদেরা বেগম, ফিরোজা বেগম, বেগম শামসুন্নাহার, সোফিয়া করিম, সারা তৈফুর, জোহরা আরা, ডা. শরিফা খাতুন, সুফিয়া আহমেদ, মোসলেমা খাতুন, আমেনা আহমেদ, স্কুলছাত্রী জুলেখা, আখতারী পারুলসহ জানা-অজানা অনেকে। ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার সময়ে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন রওশন আরা বাচ্চু। গ্রেপ্তার হন ফরিদা বারী, কামরুনাহার শাইলী, ফিরোজা বেগম, জহরত আরা রাহেলা, জোহরা আরা, খুরাইয়া, নুরুন্নাহার, সালেহা খাতুন, সাজেদা আলী প্রমুখ। একুশে ফেব্রুয়ারি ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুলের গলিতে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল, বেগম নুরজাহান মুরশেদ, দৌলতুন্নেসা খাতুন, সানজীদা খাতুন, সাজেদা খাতুন প্রমুখ। অতঃপর এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। নারায়ণগঞ্জে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন সচেতন নারী সমাজের অনেকে- ভাষার প্রতি মমত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদের এই সংক্রমণ বস্তুতপক্ষে নারী সমাজের রাজনৈতিক চেতনারই এক স্ফূর্ত দিক এবং অগ্রসরমানতার স্বাক্ষরও। নারায়ণগঞ্জের বিক্ষোভ সভায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন মর্গান বালিকা স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগম। অবশেষে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করলে ক্ষিপ্ত জনতা কোর্ট হাউস ঘেরাও করে। অতঃপর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ জনতা সংঘর্ষে আহত হয় অনেকে এবং শেষ পর্যন্ত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসকে ডাকতে বাধ্য হন প্রশাসন। একপর্যায়ে অন্যান্যদের সাথে গ্রেপ্তার হন ইলা বখসী ও ছাত্রী রেণু। পরবর্তী সময়ে মমতাজ বেগমকে মুক্তি দেওয়ার প্রশ্নে সরকারপক্ষ এক স্বীকারোক্তিতে সই করার প্রস্তাব দিলে; তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরমধ্যে স্বামী কর্তৃক তিনি তালাকপ্রাপ্ত হন এবং এভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলনে তিনি হারালেন স্বামীর সংসার। আন্দোলনের একপর্যায়ে মর্গান স্কুলেরই ছাত্রী মতিয়া চৌধুরী নিজের আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ ব্যানার লিখেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ভাষা আন্দোলনে এই যে নারীদের অপূরণীয় ত্যাগের কথা; তা কতটুকু লেখা হয়েছে? একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রতিবাদে টাঙ্গাইলে সমাবেশের আয়োজন করেন নাজমা বেগম, নুরুন্নাহার শেলী, রওশন আরা ইউসুফ প্রমুখ। ময়মনসিংহে ড. হালিমা খাতুন ও অন্যান্যরা, খুলনায় সাজেদা আলীর নেতৃত্বে মেয়েরা মিছিল করে। রংপুর আবতাবুন খাতুনের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সভা ও মিছিলের আয়োজনের কারণে গ্রেপ্তার করা হয় তার মেয়ে নিলুফার আহমেদকে। এর পরেও তিনি থেমে থাকেননি। সিলেটে আয়োজিত ছাত্রী মিছিল শেষে সমাবেশে প্রতিবাদী বক্তব্য রাখেন হাজেরা মাহমুদ। চট্টগ্রামে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে কবি মাহবুব আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে যুক্ত হন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী প্রতিভা মুৎসুদ্দী। ২১ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন সৈয়দা হালিমা রহমান, চিনা বিশ্বাস, প্রতিভা মুৎসুদ্দী, শেলী দস্তিদার, প্রণতি দস্তিদার, মীরা, খুলেখা, মিনতিসহ আরো অনেকে। ঢাকায় ছাত্র মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণে ছাত্র হত্যার খবর পেয়ে বিকাল তিনটায় আবারো রাজপথে নেমে আসে ছাত্রছাত্রীরা। প্রতিভা মুৎসুদ্দী ও তালেয়া রহমান মিছিল নিয়ে আসেন ডা. খাস্তগীর স্কুলের সামনে, ওখান থেকে গাড়িতে চড়ে “মন্ত্রিসভার পদত্যাগ চাই”, “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”-এসব শ্লোগানে সারা শহর প্রদক্ষিণে নেতৃত্বে ছিলেন দশম শ্রেণির ছাত্রী হালিমা খাতুন-জওশন আরা রহমানসহ আরো অনেকে। চট্টগ্রামের ইতিহাসে নারীদের এই ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন ছিল সেই প্রথম। আর আমরা জানি আমাদের পবিত্র শহীদ মিনারের নকশায় ছিলেন চট্টগ্রামেরই এক সৃজনশীল নারী নভেরা এবং যিনি শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে যুক্ত থেকে এই ব্যাপারে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনে নারী সমাজের অবদানে দেখি একদিকে সক্রিয়ভাবে মিছিল প্রতিবাদ সভা ও অন্যদিকে সাংগঠনিক কাজ ছাড়াও তারা তহবিল গঠন, চাঁদা সংগ্রহ এবং পোস্টার তৈরি করে বিক্রি করেছেন। মহান ভাষা আন্দোলনের ঘটনা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শতশত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো। সকাল ৮টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হলো। কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। আনোয়ারা খাতুনসহ অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে (অধিবেশনে) ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন।’ আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু আরো লিখেছেন, ‘যে কয়দিন আমরা কারাগারে ছিলাম; সকাল ১০টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে শ্লোগান দিতে শুরু করতো। আর ৪টায় শেষ করত। ছোট্ট-ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-এমন নানা ধরনের শ্লোগান। এরপর জিন্নাহর ঘোষণা-পরবর্তী সব কর্মসূচিতে নারীরা সরব ছিলেন। পরে বায়ান্নর ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন কর্তৃক জিন্নাহর ঘোষণা পুনরাবৃত্তি হলে মহান একুশের মূলক্ষেত্র তৈরিতে ছাত্রীরা সাহসী ভূমিকা রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের ছাত্রীরা আন্দোলন চাঙ্গা করতে অর্থসংগ্রহ ও রাতভর পোস্টার লেখার কাজ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজটা রওশন আরা বাচ্চুসহ আরো কয়েকজন ছাত্রীর দ্বারাই হয়। কারণ ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দুটি দলের অনেকেই গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যায়। পরে তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানির কাজ শুরু করেন ছাত্রীরাই। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলে অনেক ছাত্রী আহত হন। এরমধ্যে রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর, বোরখা শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহীম, সুরাইয়া ডলি ও সুরাইয়া হাকিম ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি বক্তৃতা করেছেন গণজমায়েতে। নেতৃত্ব দিয়েছেন মিছিলে। সহ্য করেছেন পুলিশি নির্যাতনের সকল প্রক্রিয়া- কারাবরণ, হুলিয়া ভোগ, সাময়িক আত্মগোপনকারীদের আশ্রয় দিয়ে একথাও প্রকাশ করেছেন। জানা যায়- প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে গায়ের অলংকার খুলে দিয়েছেন অনেকেই। অথচ ইতিহাসে নারীদের উপস্থিতির কথা বলা এবং ভাষাসৈনিক নারীদের পূর্ণ তালিকা পাওয়া যায়নি। সক্রিয় অংশগ্রহণকারী নারীদের রচনাবলি, বিশ শতকের শেষাবধি। ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখায় অগণিত ভাষাসৈনিক একুশে পদক পেলেও, ভাষাকন্যারা আজও অবহেলিত রয়ে গেছেন। তবে, স্বীকৃতি পাওয়াকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে ভাষাকন্যাদের একটাই চাওয়া; সর্বস্তরে হোক বাংলার ব্যবহার। ভাষাকন্যা বলেন, ‘আজও চাই সর্বস্তরে ভাষা বাংলা হোক। জাতিসংঘে বাংলা ব্যবহার শুরু হোক।’

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..