কি বিচিত্র সেলুকাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
এম আর খায়রুল উমাম: ‘সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ’। অনেক পুরোনো দিনের কথা হলেও বাংলাদেশে আজও প্রাসঙ্গিক। রাজধানী ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথের অংশে ৫ নদীর তীরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে ১১৩টি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদী দখল ও দূষণ রোধে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানান্তর ও অ্যাডজাস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই মর্মে দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি অবৈধ দখল করে প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য পুরস্কৃত করার উদ্যোগ বলেই প্রতীয়মান। অর্থ্যাৎ অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে না, পুরস্কার পাওয়া যাবে। বিতর্কের খাতিরে অনেকে বলতেই পারেন জনকল্যাণে এসব ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা হয়েছে, এখানে ব্যক্তিস্বার্থে কিছু করা হয়নি। তাই বলে মহাপ্রতাপশালী সরকার অন্যায়কে অন্যায় বলতে অক্ষম হবে। সরকারকে অন্যায়কারীদের সাথে আপস করতে হবে? কিন্তু আমাদের দেশে সর্বত্রই এমনটা দেখা যায়। সরকারের পাশাপাশি জনকল্যাণের রাজনৈতিক দলকেও অন্যায়ের সমর্থনে দাঁড়াতে দেখা যায়। এসব কর্মকাণ্ডে দেশের সাধারণ মানুষ যদি মনে করে ‘কি বিচিত্র সেলুকাস’ তাহলে বোধকরি খুব অন্যায় হয় না। পত্রিকান্তে প্রকাশ নদীতীরে অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজার রয়েছে ৭৭টি, কবরস্থান ও মৃত ব্যক্তির গোসলখানা ৫টি, ঈদগাহ ১টি, স্কুল ও কলেজ ১৪টি, স্নানঘাট, মন্দির, শ্মশানঘাট ও ১৬টি অন্যান্য স্থাপনা আছে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর বা অ্যাডজাস্টের পর সুন্দর স্থাপত্য ডিজাইনে দৃষ্টিনন্দনভাবে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলেছেন। প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সে সভায় নৌসচিব, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, নৌপুলিশের ডিআইজি, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিতিদের সরকারি বিধান ও ধর্মীয় বিধান মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখি না। শুধু জানতে ইচ্ছা করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ অন্যায়ের প্রশয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে কী শিক্ষা দিতে চান? প্রতিমন্ত্রীর এ উদ্যোগ সারাদেশে নদী দখলকে উৎসাহিত করলে অন্যায় হবে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন। সবচাইতে বড় প্রশ্ন সরকার নদীকে দখলমুক্ত করতে চায় কিনা, নাকি দেশের পরিবেশ সচেতন মানুষদের সামনে মাঝে মাঝে নাটকের মহড়া দিয়ে থাকেন? সারাবছর ধরে সারাদেশে নদী দখলমুক্ত করার কার্যক্রম চলে, সরকারের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, কিন্তু নদী দখলমুক্ত তো হয়-ই না বরং নতুন নতুন নদী দখলের শিকার হয়। অন্যায় করে শাস্তি না পেয়ে পুরস্কৃত হলে এমনটাই স্বাভাবিক। সারাদেশে যানজট অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। রাজধানীর যানজট কমাতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে কতটা উন্নয়ন ঘটেছে তা প্রশ্নের মুখে। সারাদেশের জেলাশহরগুলোতে যেভাবে যানজট সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে তাতে জনজীবন অনেকাংশেই বিপর্যস্থ হয়ে পড়ছে। এই যানজটের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রাফিক আইন না মানা। খুব সাধারণ চিত্র, ডিভাইডারবিহীন সড়কে কোনো কারণে একবার যানজট হলে তখন আর আমাদের গাড়িগুলো একটার পিছনে একটা চলে না। সব গাড়ি পাশ দিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে দৌড়াতে থাকে। যেকটা লাইন সম্ভব করে সড়ককে একমুখী করে দেয়। বিপরীতমুখী গাড়ি চলাচলের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ডিভাইডার থাকলেও রক্ষা পাওয়া যায় না অনেক ক্ষেত্রে। পুরো সড়ক একমুখী হয়ে গেলে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা চরম ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দিয়ে নিয়মভঙ্গকারী গাড়িগুলোকে আগে যাবার সুযোগ করে দিয়ে যানজট নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আজ পর্যন্ত দেখার সৌভাগ্য হয়নি যে আইন অমান্য করে যারা সড়ককে একমুখী করেছে তাদের লাইনের পিছনে অন্তত পাঠিয়ে ন্যূনতম শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও আইনভঙ্গকারীরাই শেষ বিচারে পুরস্কৃত হয়। তাহলে প্রশ্ন এসেই যায়- সাধারণ মানুষ আইন মানবে কেন? সাধারণ পথচারীদের হাঁটার জন্য ফুটপাত। সারাদেশে পথচারীরা এ ফুটপাত দিয়ে চলাচল করার সুযোগ পান না। দেশের সিংহভাগই এখন দখলের আওতায়। হয় ক্ষুদ্রব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসে আছে অথবা দোকানের মালামাল সাজানো থাকে বা নির্মাণ সামগ্রীর স্তুপ করা থাকে আর না হয় ফুটপাত মানেই নোংরা বর্জ্য ফেলার জায়গা। এর সাথে দিনে দিনে নতুন নতুন আরো বাধা যোগ হচ্ছে। সাইকেল, মটরসাইকেল, রিকশা চলছে, ভ্রাম্যমাণ ঠেলায় পণ্য বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ নির্বিঘেœ পথচলার সুযোগ চাইলে দখল মুক্তির সরকারি উদ্যোগ দেখা যায়। কিছু রাজনৈতিক দলকে বিকল্প ব্যবস্থা না গড়ে দখল মুক্তির দাবিতে রাস্তায় দেখা যায়। বিকল্প কিছু ব্যবস্থাও হয় কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। শূন্যস্থান পূরণ হতে সময় লাগে না। এভাবেই ফুটপাত দখলের পরম্পরা চলমান। জায়গাগুলো দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকার পাথেয় এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই, কিন্তু তাই বলে অন্যায়কে প্রশয় দিলে সেই অন্যায়কারী আরো শক্তিশালী হয় তা অস্বীকার করি কিভাবে? অন্যায়কারীদের পুরস্কৃত করার কারণে দখলমুক্তির কোনো আশা দেখা যায় না। দিনে দিনে দখল জোরদার হচ্ছে আর সাধারণ মানুষ এই দখল মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। মানুষের জীবন-জীবিকায় সহযোগিতার মনোভাব দেখাতে, মানবিকতা দেখাতে, ক্ষমতা প্রকাশে, আর্থিক লাভবান হতে, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে, সর্বোপরি আশু সমস্যার আশু সমাধানে দেশের সর্বত্র অন্যায়কে প্রশয় দেয়ার কার্যক্রম লক্ষণীয়। ফলে এক শ্রেণির মানুষ নিজেরা অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং আর এক শ্রেণিকে জড়িয়ে পড়তে উৎসাহিত করছে। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি তো হচ্ছেই না বরং দিনে দিনে চরম অবনতির দিকে রকেটের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ না থাকার কারণে দেশ অন্যায়কারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সড়ক দখল করে দোকান-বাজার-বাড়ি-দলের অফিস নির্মাণ করা, ব্যক্তিগত ও ব্যবসার মালামাল স্তুপ করে রাখা, ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে তোলা ইত্যাদি বাধাহীন ভাবে চলছে। একইভাবে চলছে রেলের জমি দখল। নৌপথ বাকি থাকে কেন সেখানেও চলছে দখলের প্রতিযোগিতা। মাছের ঘের, পুকুর, ইটভাটা, ধানচাষ ইত্যাদির সাথে অবকাঠামো নির্মাণ তো আছেই। সাধারণ মানুষ মনে করে দখল উচ্ছেদের নামে যে নাটক হয় তা নতুন করে পত্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে মাত্র। দখলমুক্ত করার সাথে সাথেই সে এলাকা নতুন দখলে চলে যায়। দেশের দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার তাগিদে দখলের আড়ালে বড় বড় দখলগুলো লোকচক্ষুর পিছনে থেকে যাচ্ছে। শত শত একর খাস জমি কারা ভোগ করছে, রেলের জমি কাদের জিম্মায়, ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকাইবা কোথায় চলে যাচ্ছে। শেয়ার বাজারের টাকা কাদের পকেটে, সেকেন্ড হোম কারা বানাচ্ছে, প্রকল্পের ¯্রােতে কারা সাঁতার কাটছে। এমন বহু দখলের মাঝে আছে বাংলাদেশ। যেগুলো নিয়ে কথা হলেও তা উচ্ছেদের কোনো প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না। ছোট ছোট দখলগুলো সহ্য করতে হয়, কারণ এখানেও একশ্রেণির ব্যবসা আছে। আর বড় বড় দখলগুলোকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। এক বিশাল ব্যাংক জালিয়াতির প্রেক্ষিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, একটা দেশের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকা বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য হওয়ারও কথা নয়। কারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ৪ হাজার টাকার কৃষি ঋণ আদায়ে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে ৪ হাজার কোটি টাকার পিছনে সময় দেয়া সম্ভব হয় না। একজনার পিছনে সময় নষ্ট করার চাইতে এক হাজার জনের পিছনে সময় দেয়া দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর। ফলাফল একজন প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং এক হাজার জনকে শিক্ষা দিচ্ছেন। বিশ্বে যখন কারেন্সি ছিল না তখন মানুষের বাহুবলই ছিল প্রধান শক্তি। বাহুবলে যারা সবল তারা দুর্বলের ওপর দৌরাত্ম্য চালাতো। ঐতিহ্যেও সেই ধারাবাহিকতা এখনো বর্তমান। এখনও সবলরা দুর্বলের ওপর দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে। দেশের সর্বত্র দখলগুলো তারই অংশ। ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষ প্রত্যক্ষভাবে শাসিত হতো বেশ কিছু জমিদার ও তাদের দোসর দিয়ে, তাদের জুলুম আর হুমকিতে। সাধারণ মানুষের মানসম্মান ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি পাওয়া গিয়েছিল। শোষণমুক্তি না হলেও, মৌলিক অধিকার প্রাপ্তি কার্যকর না হলেও, বিজ্ঞানের এ যুগে মানুষ বিশ্বকে হাতের মুঠোর মধ্যে পাওয়ায় অনেক কিছু জানে এবং বুঝতে পারে। তাই স্বাধীন দেশে মানুষ প্রতিদিনকার জীবনের অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য থেকে মুক্তির পথ খুঁজে ফেরে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারণকারী সরকারের কাছে ছোটবড় সবাই সমান দৃষ্টিভঙ্গী পাবে- এ আশা সাধারণ মানুষ করতেই পারে । লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, আইডিইবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..