সংগ্রামী মহীয়সী আশালতা সেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তুহিন কান্তি ধর : আশালতা সেন এক সংগ্রামী নারীর নাম। এক মহীয়সী নারীর নাম। ব্রিটিশদের কবল থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে দশ বছর বয়সেই যাঁর আন্দোলন-সংগ্রামে হাতেখড়ি, সেই আশালতা দেশ ও জাতির কল্যাণে আজীবন কাজ করে গেছেন অক্লান্তভাবে। জেল-জুলুম, শাসকের রক্তচক্ষু- কোনোকিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। অত্যন্ত মেধাবি এই নারী অসীম সাহসের সাথে আপোষহীনভাবে তাঁর শ্রম ও মেধা নিয়োজিত করেছিলেন স্বদেশের তরে। মানুষের কল্যাণে জীবন নিবেদিত সংগ্রামী এই নারীর অবদান ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে এবং থাকবে চিরদিন। আশালতা সেন স্বরূপে দীপ্তিমান হয়ে উঠেন যে রমণীর স্নেহ-মমতায় আর উৎসাহ-অনুপ্রেরণায়, তিনি হচ্ছেন তাঁর মাতামহী নবশশী দেবী। তিনিই আশালতাকে অল্প বয়সে স্বদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। নবশশী ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের এক সক্রীয় কর্মী এবং তার হাত ধরেই আশালতা সেন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বিক্রমপুর অঞ্চলে স্বদেশি প্রচারের জন্য নবশশী দেবী, সুশীলা সেন, কমলকামিনী গুপ্তা প্রমুখ ‘মহিলা সমিতি’, ‘স্বদেশি ভাণ্ডার’সহ বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলেন। এ সময় নবশশী দেবী বিলেতি কাপড় বর্জনের সংকল্পপত্রে দৌহিত্র আশালতাকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে স্বদেশি ব্রতে দীক্ষিত করেন। মাত্র এগারো বছর বয়সে আশালতা গ্রাম্য মহিলাদের স্বাক্ষর সংগ্রহকাজ অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। ক্রমান্বয়ে আশালতা সেন দেশ-বিদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বই পড়ে পরাধীন নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হতে থাকেন। পরিণয়সূত্রে তাঁকে কিছুদিন আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে হয়। ১৯১৬ সালে স্বামী সত্যরঞ্জন সেনের অকালমৃত্যুতে তিনি শিশুপুত্রকে নিয়ে অত্যন্ত বিপর্যস্ত সময় কাটান। সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হলে পুনরায় তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাহসী কর্মী, কবি ও সমাজসেবক, বিপ্লবী নারী আশালতা সেনের জন্ম নোয়াখালী জেলায় ১৮৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুর এর বিদগাঁও গ্রামে। পিতার নাম বগলামোহন দাশগুপ্ত ও মাতা মানোদা দাশগুপ্ত। পিতা ছিলেন নোয়াখালী জজ কোর্টের একজন স্বানামধন্য আইনজীবী। অল্প বয়সেই আশালতার সাহিত্যপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা পরিণতি লাভ করে। ১৯০৪ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে মাসিক অন্তঃপুর পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সংগ্রামী কবিতা সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সর্বমহলে প্রশংসিত হন। তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের কল্যাণ চিন্তা করেছেন। তাঁর অন্যান্য রচনা হচ্ছে- ‘উচ্ছ্বাস’, ‘উৎস’, ‘বিদ্যুৎ’ ও ‘ছোটদের ছড়া’। শেষ বয়সে তিনি ‘সেকালের কথা’ নামে একটি আত্মজীবনীও রচনা করেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন যখন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে, তখন আশালতা সেন সেই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনের সময় ঢাকায় আশালতা সেনের অসাধারণ সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। গড়ে তুলেন ‘গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি’। এই সমিতির কাজ ছিল মহিলাদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করা। সহকর্মীদের নিয়ে নোয়াখালী থেকে কিছু নোনা পানি ঢাকায় এনে জনসমক্ষে লবণ তৈরি করে আইন অমান্য আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। এসময় ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে আশালতা প্রথম কারাবন্দি হন। শাসকগোষ্ঠী ‘গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি’কে বেআইনি ঘোষণা করে। এসময় দু’টি মামলায় তাঁর সাজা হয়। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি বিলেতি কাপড় বর্জন করে দেশীয় খদ্দর কাপড়ে জনগণকে উৎসাহিত করতে থাকেন। বাংলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে আন্দোলন সংগঠিত করেন। সমিতির কর্মীরা নিজেরাই কাপড় বুনতেন, আবার নিজেরাই বিক্রি করতেন। ১৯২৫ সালে আশালতা নিখিল ভারত কাটুনী সংঘের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালে তিনি ঢাকায় ‘কল্যাণ কুটির আশ্রম’ স্থাপন করেন। তিনি পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদেরও শিক্ষিত ও সমাজসচেতন করে গড়ে তোলার দিকে বেশি মনযোগ দিয়েছিলেন; কেননা জনসংখ্যার অর্ধেকই যেখানে নারী, সেখানে তাদেরকে বাদ দিয়ে কোনো কিছুতেই সফল হওয়া যায় না। আন্দোলন-সংগ্রামেও না। এটা তিনি শুরু থেকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই গেণ্ডারিয়ার জুরাইনে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জুরাইন শিক্ষা মন্দির’। এছাড়াও সেসময় তিনি অনেক নারী সংগঠন গড়ে তুলেন। এর মধ্যে ‘জাগ্রত সেবিকাদল’ (১৯৩০, ঢাকা), ‘রাষ্ট্রীয় মহিলা সংঘ’ (১৯৩১, বিক্রমপুর), ‘নারীকর্মি শিক্ষা কেন্দ্র’ (১৯৩১, ঢাকা) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জুরাইন অঞ্চলের অনুন্নত সম্প্রদায়ের লোকদের আত্মোন্নয়নের জন্য তিনি নানা স্থানে ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিতেন। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে গণচেতনা জাগ্রত করার চেষ্টা করতেন। সিলেটে এবং মেদিনীপুরের কাঁথিতেও অনুরূপ নারীকর্মী শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠে। বিক্রমপুরের বিভিন্ন স্থানে মহিলা সংঘ-এর কয়েকটি শাখাও স্থাপিত হয়। ১৯৪২ সালে আশালতা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এসময় ঢাকায় পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হলে তার প্রতিবাদে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাঁকে আবারো গ্রেফতার করা হয় এবং সাড়ে সাত মাস সশ্রম কারাদণ্ড তিনি ভোগ করেন। আশালতা সেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদ এবং ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত থাকে। ১৯৬৫ সালে তিনি দিল্লিতে তাঁর পুত্র সমর রঞ্জন সেনের নিকট চলে যান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আশালতা সেন এ দেশের জনগণকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে কয়েকটি গানও রচনা করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের আমন্ত্রণে তিনি সপরিবারে ঢাকায় আসেন এবং ‘গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি’র সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি দিল্লিতে পুত্রের বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। আশালতা সেনের ঢাকার বাড়িটি বর্তমানে ‘গেণ্ডারিয়া মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। তমসাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেও তিনি সব শৃঙ্খল ভেঙে আলোর মশাল হাতে বের হয়ে এসে সমাজ-সভ্যতার অগ্রযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন। পরাধীন ভারতবর্ষের পশ্চাৎপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার সমাজে তিনি ছিলেন সত্যিকারের আলোকবর্তিকা। কর্মদক্ষতা, সাহসিকতা ও সৃজনশীল প্রতিভার স্ফূরণে তিনি সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। বিদেশি বেনিয়াদের শাসন-শোষণের যাতাকল থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে, নারীমুক্তির আন্দোলনে, শিক্ষাবিস্তারে, সমাজকল্যাণে, আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে এই সংগ্রামী নারীর অবদান চির অম্লান হয়ে থাকবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..