ধানের দাম নেই, স্বপ্ন ভাঙছে কৃষকের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেবাশীষ দাশ দেবু: হেমন্তের বাতাসে জমিতে হাসে ধান কৃষকের মনে জাগে স্বপ্নময় আশা হঠাৎ স্বপ্ন ভেঙে প্রশ্ন জাগে মনে থাকবে কি সোনালী ধানে, তার ভালবাসা! নাদের আলী একজন আদর্শ কৃষক। ধানের ওপর নির্ভর করে সংসার চলে। ধানের ফলনও ভাল হয়েছে। কিন্তু ধানের প্রকৃত দাম না পেয়ে সে হতাশ। হেমন্তের বাতাসে জমিতে যখন সে চোখ রাখে, তখন তার চোখে অনেক স্বপ্ন ভাসে। সেই স্বপ্ন ভাসতে ভাসতে জমিতে ধান পাকে। কাটে ধান। অনেক আশায় নাদের আলী বুক বাঁধে। ধান নিয়ে যায় হাটে। কিন্তু ধানের প্রকৃত মূল্য না পেয়ে কষ্টেই তার জীবন কাটে। চলতি মৌসুম থেকে শোনা যাচ্ছে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হয়েছে ২৬ টাকা কেজি দরে। কিন্তু হাটবাজারে কৃষকেরা এই দাম পাচ্ছে না। সরকারি হিসাবে এক মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪০ টাকা, কিন্তু হাটবাজারে কেনাবেচা হচ্ছে ৬২০ টাকা মণ দরে। ফলে প্রান্তিক কৃষকদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ এবার ৮৫৪ টাকা। তাহলে কৃষক বাঁচবে কী করে। মৌসুমের শুরুতে কৃষক জমিতে ধানের ফলন দেখে মনে করেছিল যাহোক সরকারি হিসাবে ধানের মূল্য যদি তারা পায় তবে তাদের কষ্টটা কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু ধান কেটে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে এসে কৃষককে হতাশায় বাড়ি ফিরে যেতে হয়। উৎপাদন খরচের চেয়ে ধানের দাম কম হওয়ায় বেশিরভাগ কৃষক ধান চাষে অনীহা প্রকাশ করছে। শুধু পেটে দু’মুঠো ভাত দিতে হয় সেজন্য তারা বাধ্য হয়েই ধান উৎপাদন করছে বলে অনেক কৃষক অভিমত ব্যক্ত করেছে। বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে বাজার মূল্যে উৎপাদনের প্রভাব পর্যালোচনা না করে, কৃষকের পূর্ণ তালিকা তৈরির জন্য প্রকৃত পদক্ষেপ না নিয়ে এবং ধান কিনতে হবে কার কাছ থেকে সে তালিকা পরিষ্কার না হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষকদের একটা জগাখিচুরী অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। সরকারিভাবে চলতি আমন মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গায় গত ডিসেম্বর মাসের বিভিন্ন তারিখে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার কাজ চলছে ২০ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু কৃষকদের তালিকা তৈরি এবং যাচাই-বাছাই ও লটারি করতে যদি সময় ক্ষেপণ করা হয় তবে কৃষকদের হাত থেকে ধান চলে যায় মজুতদারের হাতে। ফলে কৃষকদের সরকারি গুদামে ধান দেয়া আর সম্ভব হয় না। তাছাড়া ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ কৃষক এই ঘোরপ্যাঁচে বন্দি হয়ে বাধ্য হয়ে কম মূল্যে ধান বিক্রি করে দেয়। এদিকে দেখা যাচ্ছে কৃষকের নামে উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় সরকারি গুদামে রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বেশ কিছু দালাল ধান সরবরাহ করছে। এমনও দেখা যাচ্ছে একজন ৩০টির বেশি কৃষি কার্ড নিয়ে ধান খাদ্যগুদামে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনের নজরদারিতে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালালে এসব ঘটনার সত্যতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করার কথা কৃষি কার্ডধারী কৃষকদের। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা বা দালালরা কৃষকদের কাছ থেকে ন্যূনতম মূল্যে কৃষি কার্ড নিয়ে নিজেরাই আর্থিক লাভবান হতে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহের বাণিজ্যে নেমে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাটে হাটে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র খুলে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার দাবিতে সিপিবি, বাসদসহ বিভিন্ন বাম গণতান্ত্রিক জোটের পক্ষ থেকে মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। একদিকে বীজ, কীটনাশক, সেচসহ কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি অপরদিকে কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচই তুলতে পারছে না তারা। ফলে দেখা যাচ্ছে কৃষক একবার কিনতে গিয়ে ঠকচে আবার বেচতে গিয়েও ঠকছে। একদিকে কৃষককে বাঁচাতে সিপিবিসহ গণতান্ত্রিক বাম জোটের নেতৃবৃন্দ হাটে হাটে সরকারি ক্রয় কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়, প্রতি ইউনিয়নে শস্যগুদাম নির্মাণ করে সব মৌসুমের শস্যাদি কমানো এবং সক্ষমতা বাড়াতে সব কৃষি উপকরণ বি.এডিসির মাধ্যমে সরবরাহ করার দাবি বিভিন্ন সমাবেশ থেকে উত্থাপন করছেন। এছাড়া সহজ শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, লাল নোটিশ বন্ধ, মহাজনী ঋণ বন্ধসহ উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক কারখানা গড়ে তোলার জন্য সমাবেশগুলো থেকে দাবি তোলা হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে এবার আমনের ফলন ভাল হওয়ায় হাটবাজারগুলোতে প্রচুর ধানের আমদানি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় ধানের দাম কমে গেছে। বেশ কিছু ধানের আড়তদারদের কাছ থেকে জানা গেছে যে, চালকলের মালিকরা পূর্বের তুলনায় ধান কেনা কমিয়ে দেয়ায় বর্তমানে তারা কৃষকদের কাছ থেকে বেশি ধান কিনছেন না। ফলে ধানের বাজার পড়ে গেছে। অন্যদিকে বেশ কিছু চালকল মালিকদের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে, চাল বিক্রি করে তারা যে টাকা পায় সেই টাকা দিয়ে তারা ধান কিনে থাকে। কিন্তু চালের মোকামগুলোতে চাল বিক্রি কিছুটা স্থিতি অবস্থায় রয়েছে। ফলে মিলগুলোতে চালের মজুত জমে গেছে। তাছাড়া গত বারো মৌসুমে চাল এখনো অনেক মিলেই রয়ে গেছে। এজন্য তারা বর্তমানে বাজার থেকে ধান ধীরগতিতে ক্রয় করছে। গাইবান্ধা জেলার লক্ষ্মীপুর হাটে ভ্যানে করে ১২ মণ ধান বিক্রি করতে এসেছিলেন অশোক সরকার। হাটে এসে অল্পসংখ্যক ক্রেতার দেখা পেলেও ধানের দাম কম বলায় ভ্যান ঘুরিয়ে ধান ফিরে নিয়ে গেছেন বাড়িতে। কয়েকদিন আগেও ধানের মূল্য যা ছিল তার চেয়ে কম মূল্য হওয়ায় তিনি বাধ্য হয়েই ধান ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। এদিকে স্বর্ণা-৫ জাতের মোটা ধান ৬৫০ টাকা, ব্রি-৪৯ জাতের ধান ৬৭০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা, পাইজাম ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে হাটে ধান বিক্রি করতে আসা ধনকুঠি গ্রামের হাসান মিয়া বলেন, ধানের বাজারে ধস নামার কারণে ১২ বিঘা জমিতে তার ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। এবার আবাদের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধান বেশ ভালো হয়েছে প্রায় সব জায়গায়। আর সরকারিভাবে যে পরিমাণ ধান কেনার কথা বলা হচ্ছে তাতে আদতে কৃষকদের অবস্থার কতটুকু উন্নতি হবে তা ভুক্তভোগী কৃষকরাই জানেন। সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কৃষকদের যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই তাতে গড়মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেশিরভাগ উপজেলা ও জেলা খাদ্য অফিসে কৃষকের শুমারি করার তালিকা স্থায়ীভাবে থাকতে দেখা যায় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই তালিকা যথাসময়ে হালনাগাদ না করায় পরে তাড়াহুড়া করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরাও এই তালিকা থেকে হরহামেশা বাদ পড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। এবার অনেক জায়গাতেই কৃষকদের পূর্ণ তালিকা তৈরি করা হয়নি। আবার কার কাছ থেকে ধান কিনতে হবে এই তালিকা সুস্পষ্ট না হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেনার পদ্ধতি স্পষ্ট নয়। তাই প্রকৃত কৃষকদের সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে। কৃষকদের কাছে সরাসরি ধান কেনার সিদ্ধান্ত যদিও সরকারের একটা ভাল সিদ্ধান্ত কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্তে প্রকৃত কৃষকরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট সবার ভেবে দেখা উচিত। কেননা এর সাথে সংশ্লিষ্টদের ক্রয়, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়া, দেখভালের দায়িত্ব, মনমানসিকতা কোনটাই তাদের কৃষকের কথা মাথায় রেখে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। যার দরুণ অনেক ক্ষেত্রেই ভাল ভাল সিদ্ধান্ত বা কথা লিপিবদ্ধ থেকে যায়, বাস্তবরূপ লাভ করে না। উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু কৃষক ও পাইকারদের কাছ থেকে জানা যায় যে, এবার বোরো মৌসুমে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হওয়ায় ধানের দাম কমেছে। তাছাড়া চালকল মালিকদেরও হাটবাজারে খুব একটা দেখা মিলছে না। ফলে ফরিয়া বা পাইকারদের কাছে ধান কম মূল্যে বিক্রি করতে কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে মনে করেন ধানের দাম কমার প্রধান কারণ হচ্ছে উৎপাদনের সাথে সরকারি ক্রয়ের সামঞ্জস্যের অভাব। ইতোপূর্বে সরকার মিল মালিকদের কাছ থেকে শতভাগ চাল কিনেছে। কিন্তু এবার চাল কেনা হবে ৪০ শতাংশ। এ কারণেও চালকল মালিকরা ধান কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তাছাড়া সরকারি ধান সংগ্রহের ধীরগতি ধানের দাম কমার আর একটি কারণ। অনেক জায়গায় এখনও পুরোদমে ধান সংগ্রহ অভিযান চালু হয়নি। যার দরুণ বাজারে ধান ক্রয়ের প্রভাব হাট-বাজারগুলোতে পড়বে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য। আর বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই একমাত্র এই ভাতের ওপরই নির্ভরশীল। ১৭ কোর্ট জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটিতে বিশাল অংশের ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে এই ভাত। আর প্রতিবছর প্রকৃত ধানের মূল্য না পাওয়ায় ধানচাষযোগ্য জমিও ক্রমান্বয়ে কমে যেতে বসেছে। আবাসন, শিল্পায়ন, ফল, ফুল কিংবা মাছ চাষের জন্যও ধানী জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ১৯৮০ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১০ লাখ একর। ২০৭ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ একরে। বর্তমান এক যুগ পরে এর পরিমাণ নিশ্চয়ই আরও কমে গেছে। তারপরও কৃষি বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং কৃষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কম জমিতেই ব্যাপক ধানের উৎপাদন শুরু সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধানের দাম অস্বাভাবিক হ্রাস এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কৃষকদের অবস্থা নাজেহাল। বাংলাদেশের বেশিরভাগ কৃষক অল্প জমির মালিক এবং ভাগচাষি। ফলে ধানের প্রকৃত মূল্য না পেলে তাদের ঋণগ্রস্ত হতে হয়। এমন একটা অবস্থায় কৃষকরা বাধ্য হয়েই ধানচাষে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এদিকে উত্তরাঞ্চলের অনেক ধানী জমিতে আম বাগান, মৎস্য চাষের জন্য পুকুর খনন এবং শাক-সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এগুলোর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে সেগুলো ধান চাষের বিকল্প হতে পারে না। দিনের পর দিন যে হারে ধানী জমির পরিমাণ কমছে সে হারে ধানের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ কম। আর আমাদের এই দেশে চালের ওপর বাঙালির নির্ভরশীলতা সহজে কাটানো যাবে না। বাংলাদেশে ধানের বাজারে মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা এখন একটা বড় ধরনের জায়গা করে নিয়েছে। তারা ধান উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত না হয়েও কৃষককে ধরাশায়ী করে ফেলেছে। এদের অনেকের কাছে বাকীতে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। ফলে দিনের পর দিন কৃষকের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তাই এখনই এই অবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত কৃষকদের মেরুদণ্ড সোজা করতে হবে। কৃষক যাতে ধান কাটার পরপরই ধানের প্রকৃত মূল্য পায় সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর রাখতে হবে। তবেই ধান উৎপাদনের সফলতা ধরে রাখা সম্ভব হবে- নচেৎ নয়। লেখক : কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..