ভাষা সংগ্রামীদের অবমাননা আর কতদিন সহ্য করতে হবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কামাল লোহানী : রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই ‘একুশে পদক’ প্রবর্তন করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে হলেও স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল শিক্ষা উপদেষ্টা থাকার কারণেই যে এই পদক চালু হয়েছিল, সেকথা আমরা জানি। এই ‘পদক’ দেওয়া নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, এ নিবন্ধে সে প্রসঙ্গে না গিয়ে ভাষা শহীদ এবং ভাষা সংগ্রামীদের প্রতি কী আচরণ করা হচ্ছে সে কথাই তুলে ধরতে চাই। অবশ্য একুশে পদকের কথা এ ক্ষেত্রে এসেই যাচ্ছে। যাঁরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁদের অবজ্ঞা করে এবং প্রচলিত পদক না দিয়ে নানা সময়ের সরকার কী বোঝাতে চাইছেন তা আজও বোধগম্য নয়। প্রায় সাত দশক হতে চললো ভাষা আন্দোলনে রক্তদান, তারপরও সংগ্রামের প্রথম সারির নেতারা আজও কেন বঞ্চিত এই সম্মান থেকে? তবে এটা ঠিক, ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে কারা সংগ্রাম করেছেন করেছেন অথবা কারা করেননি। একটা প্রশ্ন করি যে, তাদেরকে একুশের পদক না দেওয়া সত্বেও তারা কি ইতিহাস থেকে বাদ হয়ে গেছেন? না হন নি। থাকবেন চিরটাকাল, পদক পান আর না পান। ভাষা সংগ্রামকে আমরা বলে থাকি মুক্তিসংগ্রামের প্রথম সোপান, যার চূড়ান্ত পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কী অসাধারণ এই রক্তিম পথচলা। বায়ান্ন থেকে একাত্তর- ইতিহাস পরিক্রমায় এই ভাষা সংগ্রামের বীর যোদ্ধারাই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কুশীলব। ভারতবর্ষের ধর্মভিত্তিক বিভাজনের পর উপনিবেশিক পাকিস্তানি দুঃশাসনে আমরা বাংলার মানুষ নিষ্পেষিত হয়েছিলাম দুঃশাসনের যাঁতাকলে। আর তারই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিল ১৯৫২ এর রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারী। আমরা কিন্তু যে সরকারই ক্ষমতাসীন থাকিনা কেন ‘পদক’ প্রদানে দারুণ উৎসাহী থাকি। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদেরকেই বঞ্চিত করে বিভিন্ন আমলের সরকার নিজ নিজ লোকদেরকে পদক দিয়ে যাচ্ছেন। কোন বিচারে যে পদক দিচ্ছেন তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও ‘পদকপ্রাপ্ত’দের মধ্যে মহানন্দের ঢেউ উঠছে। অথচ ভাষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের নাম বারবার প্রস্তাব করেও ব্যর্থ হতে হচ্ছে। এই পদক প্রদানের জন্য দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কোন কমিটি গঠন করা হয়নি। কেবলমাত্র মন্ত্রীদের সহায়তায় আমলারা এই তালিকা প্রস্তুত করছেন প্রতি বছর। সবটাই জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়ে সরকারের কাছে আসে আর শিল্পকলা একাডেমিও কিছু ‘আবেদনপত্র’ সুপারিশসহ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এই সুপারিশ বা প্রস্তাবনা যে পদ্ধতিতে চূড়ান্ত করা হয় তাতে করে ভাষা সংগ্রামের বয়োবৃদ্ধ অর্থাৎ অশীতিপর থেকে নবতিপর পর্যন্ত যেভাবে উপেক্ষিত হয়ে চলেছেন তা সত্যিই গর্হিত। বিভিন্ন সময়ের সরকার যদি নিজ নিজ ব্যক্তিদের পদক দিতে চান, তা দিন। কিন্তু যাদেরকে উপলক্ষ করে এই পদক তাঁরা কেন উপেক্ষিত হচ্ছেন? একথা ঠিক লড়াই সংগ্রামের সময় কেউ ভাবেননি যে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা ছাড়া কখনও কোনো পুরস্কার পাবেন। কিন্তু লেখক বা সাহিত্যিক যাদের পদক দেওয়া হয় তাতে যথোপযুক্ত ভাষা সংগ্রামীর নাম কমই চোখে পড়ে। একথা সত্যি যে, পদক সৃষ্টি হয় কৃতিত্বের জন্যে, আবার তা দেওয়া হয় প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্যেও। এসব ক্ষেত্র সম্পর্কে তো কারো আপত্তি নেই, আপত্তি আছে ব্যক্তি নির্বাচনে বা মনোনয়নে। পদক যথার্থ ব্যক্তির হাতে গেল কিনা তা কেবলমাত্র প্রস্তাবক, মন্ত্রী ও আমলাদের দ্বারাই নির্ধারণ করা হয়। অথচ এঁরা কেউই উপযুক্ত ব্যক্তি নন। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বা জীবিত ভাষা সংগ্রামী অথবা বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়েই এই মনোনয়ন কমিটি হওয়া দরকার। এই মনোনয়ন কমিটি তাদের কাজ সম্পন্ন করার জন্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারে। পদক বিতরণে যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় তার বিন্দুমাত্রও দেখতে পাচ্ছি না ভাষাসংগ্রামের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে। ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পার হলেও কতজন ভাষা সৈনিক শহীদ হয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জেলায় কতজন ভাষা সৈনিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার তালিকা আজও প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। শুনেছি উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ জারি করা হয়েছে ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা প্রস্তুতির জন্য, কিন্তু সরকারের তরফ থেকে আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অথচ তালিকা প্রস্তুত করে প্রতি বছর পদক বিতরণ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশবাসী প্রায় সকলেই, হয় সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন অথবা অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যে কোন মুহুর্তে মৃত্যুর আশঙ্কা উপেক্ষা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাঙ্গীণ প্রচারে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছিলেন। এবং সম্ভ্রম বিসর্জনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন অগুনতি মা বোন। যে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে এই ‘মুক্তিযোদ্ধার তালিকা’ প্রণয়নে প্রচণ্ড উৎসাহী হয়ে ওঠেন। শুধু উৎসাহীই নয়, তারা নিজ নিজ আমলে আপন স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে একটি অথবা একাধিক তালিকাও প্রস্তুত করে থাকেন। অবশ্য মুক্তিযোদ্ধার তালিকার প্রয়োজনে তাদের সকলেরই নজর থাকে কেবলমাত্র সশস্ত্র লড়াইয়ের যোদ্ধাদের প্রতি। মুক্তিযুদ্ধে আমরা দেশবাসী সকলেই অংশগ্রহণ করেছি এটা রূঢ় বাস্তব। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল গুটি কয়েক রাজাকার, আলবদর, আল-শামস ও যুদ্ধাপরাধীর তালিকা প্রস্তুত করা, কিন্তু কেউই তা করেননি। আর সে কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে শ্রেণীবিন্যাস করার ভাবনা ভেবেছেন। আবার দেখছি মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৪৭ বছর পর বর্তমান সরকার চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র এবং পরে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কর্মরতদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। স্বীকৃতির জন্য কৃতজ্ঞ, কিন্তু কেন এই বিলম্ব? স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র কি ২৬ মার্চ ১৯৭১ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করে দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়নি? অথবা ২৭ মার্চ মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেননি? এই শব্দ সৈনিকদের অস্তিত্ব না হলে তখন সমগ্র দেশে দলমত, ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান ও চেতনা কি পৌঁছে যেতো? যাই হোক, আমি জানি না মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা প্রস্তুতির উদ্যোগ বারবার নেওয়া হচ্ছে এবং প্রস্তুতও করা হচ্ছে, কিন্তু রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে না, এর পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? এসব কারণেই আজ দেশে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার’ ধোঁয়া উঠেছে। কে যে সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা, এখন দেখছি তা-ও নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ গাইলাম বলে সবার কাছে মনে হবে। গাইলাম কারণ হলো ভাষা সৈনিকদের সংখ্যা কিন্তু সীমিত ও স্বল্পসংখ্যক ছিল এবং তাঁদের তালিকা প্রস্তুত করা খুব একটা অসাধ্য কিছু ছিল না। ৫২’র পর প্রায় ২০ বছর চলে গেছে, আমরা পাকিস্তানিদের অপশাসনেই বাস করেছি এবং তখন এই তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। আমরা ভাষা সৈনিকেরা মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে উদ্যোগ গ্রহণ করে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়েছিলাম, যা আজও বিদ্যমান তার নাম হলো ‘একুশের চেতনা পরিষদ’। ভাষাসৈনিক গাজিউল হক-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক সে দায়িত্ব পালন করছেন। আজও সংগঠনটির অস্তিত্ব আছে। এরাঁই ১৯.... সালে (এখানে একটি সালের উল্লেখ আছে, লোহানী ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে) সাভারে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্মীয়মান প্রেস ভবনে তিন দিনব্যাপী ভাষাসৈনিক সম্মেলন করেছিলেন এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায় চারশ ভাষা সৈনিককে একত্রিত করেছিলেন। তবে এঁরাই যে সব তা নয়, আরো অনেকে ভাষা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন যারা সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি। সম্মেলন প্রস্তুতি পর্বে ডাঃ জাফর উল্লাহ চৌধুরী একুশের চেতনা পরিষদের নেতৃবৃন্দকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন। আর তাঁর কারণেই গাজিউল হক, পরিষদের সম্পাদক কামাল লোহানী ও সদস্য শফিক খান, বিভিন্ন জেলা সফর করে ভাষা সৈনিকদের সাথে যোগাযোগ করেন। তারই ফল হিসেবে প্রথম ভাষা সৈনিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছেন সাভার ও ঢাকার অগণিত জনগণ এবং কণ্ঠ ও নাট্য শিল্পীদল। এই মহতী সম্মেলন উদ্বোধন হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধে এবং ১৯৫২ সালে যিনি পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদে ছাত্রদের উপর গুলি চালনা সম্পর্কে মূখ্যমন্ত্রীর প্রতিবেদন দাবি করেছিলেন, সেই মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ ছিলেন সম্মেলনের প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক। এই সম্মেলনের তিনদিন পরে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ আমার বক্তব্য হলো স্বল্পসংখ্যক ভাষা সৈনিকদের তালিকা প্রস্তুত করা খুবই প্রয়োজনীয় ছিল এবং সম্ভবও ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। অথচ সকল দেশবাসী যেখানে মুক্তিযোদ্ধা, সেখানে তাদের তালিকা প্রস্তুত করতে এত ‘শখ’ কেন? ভাষা সৈনিকদের কিংবা পরবর্তীকালে ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা প্রস্তুত করেন বা না করেন, এই ‘একুশে পদক’ দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের কেন এ কৃপণতা, অবজ্ঞা-অবহেলা? এ পদক কেবল ভাষাসৈনিক বা ভাষা সংগ্রামীদের জন্যই নয়, এ তো শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক নানা পেশার সকল বুদ্ধিজীবীর জন্য। যদিও ক্ষমতাসীন সরকারের কিংবা রাজনৈতিক দলের ও জোটের ইচ্ছা অনুযায়ী এই পদক বিতরণ করা হয়ে থাকে, তবু ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণকারীরা কি এই পদক আজ সাত দশক পরও আশা করতে পারেন না? অবশ্য প্রশ্ন উঠতে পারে পদক প্রবর্তণের পর থেকে এই পর্যন্ত যাদের দেওয়া হয়েছে, তাদের সবাই কি আদৌ এই পদকের জন্য উপযুক্ত? ১৯৪৮-এ ভাষা আন্দোলন সূচিত হলেও উদ্যোগীরা পিছিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক চিন্তার কারণে। কিন্তু কিছু প্রগতিশীল ছাত্র প্রতিনিধি ও পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী অকুতোভয় ছাত্রসমাজের বিপুল প্রতিরোধ আর মুসলিম লীগশাহী মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনের গুলি চালনার নির্দেশে সৃষ্টি হয় রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারী। সেই ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা অনেকেই আজও পর্যন্ত রাজনৈতিক দলীয় সরকারগুলোর ‘কৃপাধন্য’ হতে পারলেন না। লজ্জ্বায় মাথা হেঁট হয়ে আসে, যখন শুনি আমাদের দেশের ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক দলগুলো হরহামেশাই বলছে ‘ভাষা সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ’ কিংবা মুক্তিসংগ্রামের প্রথম সূচনা করেছে ৫২’র ভাষা আন্দোলন। তারপরও যখন প্রদানকারী সংস্থার পদক দেওয়ার ব্যাপারে চৈতন্যোদয় ঘটে না, তখন নিজেদেরই ‘লানত’ দিই। ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে মোহাম্মদ সুলতান, মোহাম্মদ ইমাদুল্লা, মোহাম্মদ ইলিয়াস’সহ প্রত্যন্ত জেলাসমূহের বহু ভাষা সংগ্রামী রয়েছেন যাঁদের আজ পর্যন্ত পদক দেওয়া হয়নি। একথা সত্য যে, পদক বা কোন পুরষ্কারের জন্য তাঁরা আন্দোলন করেন নি। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থা প্রবর্তণই হয়েছে তাঁদের আন্দোলনকে উপলক্ষ করে তখন সেই আন্দোলনে অমিততেজ নেতাদের এতদিন ধরে বাদ দেওয়া হয়েছে কেন? এ প্রশ্ন কি রাষ্ট্রের কাছে করতে পারি না? ঊর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ওপরে যে চারজন ছাত্রনেতা কালোপতাকা উড়িয়ে ছিলেন, তাদের মধ্যে মোহাম্মদ সুলতান একজন। শুধু কি তাই, তিনি তো পুঁথিপত্র প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনী সংস্থা গড়ে তুলে ছাত্রনেতা হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ শিরোনামে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন, যা আজো রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রথম প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিদ্যমান। মোহাম্মদ ইমাদুল্লা তুখোড় বক্তা ছিলেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে আয়োজিত নামাজে জানাজার পর ঐ বিশাল সমাবেশে যে আবেগময়ী বক্তৃতা করেছিলেন তা উপস্থিত সকলেরই মনে আছে। তাই নয় শুধু, পাকিস্তানি দুঃশাসনের সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রামে যুব সম্প্রদায়কে সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই ইমাদুল্লাই। মোহাম্মদ ইলিয়াস ছিলেন প্রথম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। পরে তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে বারবার জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ চা বাগান মালিক সমিতির সভাপতিও ছিলেন। যে নামগুলো উল্লেখ করলাম, তারা ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে আছেন বহু নাম না জানা ভাষা সংগ্রামী। আমরা কি বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকৃত ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা প্রস্তুত করতে পারি না? এজন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষমতাসীনেরা কি দেশে আজো ভাষা সংগ্রামের যে সব লড়াকু সৈনিক বেঁচে আছেন তাদের সাথে বর্তমান বরেণ্য বুদ্ধিজীবিদের যুক্ত করে একটি কমিটি বা কমিশন গঠনের মাধ্যমে ভাষা সংগ্রামীদের তালিকা প্রস্তুত করতে পারেন না? এখনও যারা জীবিত আছেন, তাঁরা প্রয়াত হলে সে সুযোগটাও নষ্ট হয়ে যাবে। শুনেছি ২১ এর রাতের অন্ধকারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের লাশ সরিয়ে ফেলেছে, তারপরও কি কখনো কোনো চেষ্টা করা হয়েছে ভাষা শহীদদের তালিকা তৈরি করতে? ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, আরো অনেকে। কিন্তুু তাদের উদ্দেশ্যে নির্মিত যে স্মৃতির মিনার ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার’ হিসেবে আমাদের সামনে প্রতিষ্ঠিত এবং সকল সমস্যা সংকটে যার কাছে আমরা প্রতিদিন ছুটে যাই, সেই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভটি আদৌ কি নভেরা আহমদ ও হামিদুর রহমানের নকশা অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে? এ কথা কি রাষ্ট্রকে জিজ্ঞাসা করা যায়? আর যেটুকু বা হয়েছে, তার পবিত্রতা রক্ষায় আদৌ কেন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে কি ভাবতে হবে, ভাষা সৈনিকদের যে অবদানের কথা শুনি রাজনীতিবিদদের মুখে, তা শুধুই কথার কথা? আর কতকাল প্রয়োজন হবে ওঁদের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হতে? লেখক : সাবেক সভাপতি, উদীচী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..