ভোটের ময়লা পরিষ্কারে কুযুক্তির জাল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : সিটি ভোটের আগের কয়েক সপ্তাহ ঢাকাবাসীর জন্য এক অর্থে যন্ত্রণাদায়ক সময় গেছে। সকাল থেকে রাত-দুপুর পর্যন্ত নকল গানে ভোটের প্রচার, কান একেবারে ঝালাপালা। কেউ কেউ তো বিরক্ত হয়ে অভিশাপ পর্যন্ত দিয়েছেন। আগের রাতে যার প্রচারযন্ত্রে বিরক্ত হয়ে অভিশাপ দিয়েছেন, হয়তো পরের দিন সকালে তাকে ভোটও দিতে গিয়েছেন। বাঙালি এমনই। ভোটের কথা শুনলে হুঁশ থাকে না। ভোট তার কাছে উৎসবের মতো। নেচে-গেয়ে, দুপুরের রোদে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বাঙালি সপরিবারে ভোট দিতে পছন্দ করে, অভ্যস্ত। শত বছরের বৃদ্ধ, বিছানা থেকে হয়তো উঠতে পারেন না, তারপরেও নাতিকে বলবে, ‘এই আমারে একটু কোলে করে ইস্কুলে নিয়ে চল, আরেকবার ভোটের সময় হয়তো আর থাকবো না, কাসেমের পোলাডারে ভোটটা দিয়ে যাই।’ তো, ভোট ভোট করতে করতে ঢাকা শহরের ভোট শেষ হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের হাতেই বাংলাদেশের সদরদপ্তর পাকাপোক্তভাবে রয়ে গেছে। (আসলে যুদ্ধের ময়দানে কোনো সেনাপতিই কোনোদিন সদরদপ্তরের পতন চান না।) এখন চলছে ভোটের বিশ্লেষণ। আর এই বিশ্লেষণই যেন বলে দিচ্ছে, শেষ হইয়াও ভোট হইল না শেষ। কারণ, ভোট শেষ হলে এক অর্থে আইনগত দিক থেকে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ভোট দেওয়ার জন্য ইসি মানুষকে ধন্যবাদ জানাবে, বিজয়ী হলে রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, আর পরাজিত হলে ফল মেনে নেবে। এটাই গণতন্ত্রের নিয়ম। অন্যদিকে ভোট কেমন হলো, জয়-পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান এসব বিষয় সবসময়ই রাজনৈতিক দলেরই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এসব বিষয় নিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিচার-বিশ্লেষণ করেন নেতারা, বাইরে সাধারণত কথা বলেন না। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম হয়েছে। এখন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন- সবাইকে আগ বাড়িয়ে সাফাই গাইতে হচ্ছে সিটি নির্বাচনটা খুব ভাল হয়েছে বলে। নির্বাচন ভাল হয়েছে এই সাফাই নির্বাচন কমিশন আর ক্ষমতাসীনদের তখনই গাইতে হয়, যখন আসলে ভোট ভাল হয় না। (এক্ষেত্রে চোরের মার বড় গলা প্রবাদটা মনে রাখলেই বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে।) ঢাকা শহরের ভোটও আসলে ভাল হয়নি। ভোট ভাল হয়নি বলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এখন এটাকে ‘ভাল বানানোর‘ জন্য লাগামহীনভাবে তাদের কণ্ঠ আর দলদাস মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে, এই সরকারের আমলে ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই চলে গেছে। এখন এই ঢাকা সিটির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের আস্থা আর বিশ্বাসের কফিনে শেষ পেরেকটিও ঠুকে দেওয়া হলো। মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা আর তাদের বংশবদ ইসি ভোটের দাফন-কাফন শেষ না হওয়া পর্যন্ত লাগাতারভাবে তাদের যুক্তিহীন পাগলের প্রলাপ শুনতে মানুষকে বাধ্য করবে। যেন এটা ভোটারের প্রতি তাদের এক অনিঃশেষ প্রতিশোধ- ব্যাটা তুই ভোট না দিয়ে আমাদের প্রতি অনাস্থা দেখিয়েছিস, এখন আমি তোর কানের কাছে সারাদিন মাইক বাজিয়ে বলতে থাকবো- ভোট ভাল হয়েছে, ভোট ভাল হয়েছে, উন্নত দেশে এমনই ভোট পড়ে, শতবছরের শ্রেষ্ঠ নির্বাচন হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এটাও কম না। কারণ, যাদেরকে মানুষ টিভির পর্দায় সারাদিন তোষমোদি, গালাগালি, আত্মম্ভরিতার মতো সচরাচর উচ্চারিত কথামালায় নিজেদের ব্যস্ত থাকতে দেখেন, তারা যে এসব ‘ত্যাগ’ করে ভোট শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভোটের পেছনেই নিরলসভাবে দিবস-রজনী কথা ব্যয় করে যাচ্ছেন, এটাই বা কম কিসে! রাজধানী শহরে প্রায় দেড় কোটি লোকের বাস। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি মিলিয়ে ভোটার প্রায় ৫৫ লাখ। কিন্তু নির্বাচনে ভোট পড়েছে ১৫ লাখেরও কম। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ ভোটার কেন্দ্রেই যাননি। এই অবস্থায় খাতা-কলমে মোট ভোটারের ১৫ শতাংশেরও কম জনসমর্থন নিয়ে ঢাকা উত্তরের মেয়র হয়েছেন আতিকুল ইসলাম আর দক্ষিণে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসও মেয়রের চেয়ারে বসেছেন সাড়ে ১৭ শতাংশের কম ভোটারের ভোট নিয়ে। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, বড়জোর সাত থেকে নয় শতাংশ ভোট পড়েছে। সবশেষ ২০১৯ সালের উপজেলা নির্বাচনেও ভোট পড়েছিল ৩৭ থেকে ৪৩ শতাংশ আর এর কিছু আগে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসি ভোটের হার দেখিয়েছিল ৮০ শতাংশ। কিন্তু ঢাকা সিটিতে কেন এতো কম ভোট পড়লো এ নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রধান দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের যে ‘নিজস্ব ভোট-ব্যাংক’ সেই অংশটিও আসলে ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়নি। এছাড়া আরো অনেক কারণেই কথাই বলছেন, আওয়ামী লীগ নেতা ও নির্বাচন কমিশন। একনজরে সেগুলো একটু চোখ বুলিয়ে দেখে নেওয়া যাক। ‘শত বছরের শ্রেষ্ঠ’: ১ ফেব্রুয়ারি ভোট শেষ হওয়ার পর পরই আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের প্রতিক্রিয়া জানায়। ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে এই প্রতিক্রিয়া দেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, ‘আজকে যে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছে, আমার মনে হয় বাংলাদেশে গত ১০০ বছরের যদি যেকোনো নির্বাচনকে পর্যবেক্ষণে আনা হয়, তাহলে এরকম অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আর কখনো দেখা গিয়েছে কি না এটা আমার সাংবাদিক বন্ধুরা ভাল বলতে পারবেন।’ বাংলাদেশে স্বাধীন হয়েছে ৪৯ বছর চলছে। আগামী বছর সারা দেশে সাড়ম্বরে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর প্রাক্কালে সত্তরের ভোট একটি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এখানে প্রায় সবকটি আসনে জয়লাভ করেছিল। পাকিস্তানের জুলুম-নির্যাতন-অত্যাচার থেকে বাঁচতে মানুষ একচেটিয়াভাবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল। মূলত মানুষ এই ভোট দিয়েছিল স্বাধীনতা পক্ষে। মাহবুব-উল হানিফের কথা শুনে যে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এই সিটি নির্বাচনটা কি তার চেয়েও ভাল ছিল? সামরিক সরকারের আমলের ভোটগুলো বাদ দিলে নব্বইয়ের স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর এদেশে যে নির্বাচন হয়েছে সেগুলোর অনেকগুলোই মানুষের কাছে আপাত অর্থে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। সেই নির্বাচনের চেয়েও কী এই নির্বাচনটা ভাল ছিল? ‘আমরা আর কত উন্নত হব মেয়র সাহেব?’: ভোটে পাস করার পর ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে মানুষের ভোট দেওয়ার হার কম থাকে। বাংলাদেশও উন্নতির দিকে যাচ্ছে, তার প্রমাণ হলো ভোটার উপস্থিতি কম হওয়া। দেশ উন্নত হচ্ছে বলেই ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোট কম পড়েছে।’ আতিকুল ইসলাম ছিলেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের নেতা। তিনি তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলেন। প্রথমবার উপ-নির্বাচনে যখন আতিকুল মেয়র হন সেই ভোটও ছিল নিরুত্তাপ। বিএনপি সেই নির্বাচনে যায়নি। আর এবার তিনি হিসাবমতে গড়ে ১৫ শতাংশের কম ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়রের আসনে বসেছেন। ভোট কম পড়াটাই আতিকুলের কাছে দেশ উন্নত হওয়ার লক্ষণ। তাহলে ‘আতিকুলাস সূত্র’ অনুযায়ী, কোনো দেশে ভোটকেন্দ্রে যদি ১০ শতাংশ ভোট পড়ে তাহলে সেই দেশ আরো উন্নত। ৫ শতাংশে ভোট পড়লে সেই দেশ হবে অতি উন্নত। আর কোনো দেশে যদি ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটারই না যায় তাহলে বুঝতে হবে সেই দেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। বিচিত্র, সেলুকাস মেয়র! আমরা কবে এভাবে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাব? উন্নতির লক্ষণসমূহ: আতিকুল যখন ভোটের হিসাব দিয়ে দেশের উন্নতির সূচক নির্ধারণ করছিলেন, তখন তার আরেক সহকর্মী বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী সংসদের ভিন্ন তথ্য দিচ্ছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদকে বলছিলেন, দেশে মাত্র এক বছরের মধ্যে ৬০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ৩২ হাজার ৫৮২ জন শ্রমিক। আর নিট্ওয়্যার খাতের ২৮০টি কারখানা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী, তিনি নিজেও একজন গার্মেন্টস মালিক এবং এক সময় গার্মেন্টস মালিকদের নেতা ছিলেন। নিট্ওয়্যারের যে ২৮০টি কারখানা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়েছে বলা হচ্ছে সেগুলো তো কার্যতই বন্ধই। না কি? ওই ২৮০টি কারখানায় কতো হাজার শ্রমিক ছিলো? তারা কি বেতন ভাতা পাচ্ছে? ৩২ হাজার ৫৮২ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবারের সদস্য কতো জন? গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে চাকরি হারানোয় এই মানুষগুলোর জীবনের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে? মেয়র আতিকুল সাহেব না আবার কোনদিন বলে বসেন, গার্মেন্ট বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছে তার মানে হচ্ছে আমরা উন্নত হচ্ছি! (সব সম্ভবের দেশ এই বঙ্গদেশ)। মাত্র এক বছর আগেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) একটা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশেই বেশি। ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা ও ভুটান এ হার কমিয়ে এনেছে। ভারতে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে বেড়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে। যা! দুষ্ট ফেসবুক: সারাবিশ্বই এখন একসূত্রে বাঁধা। এই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন না এলে এটা অনুধাবনই করা যেত না। ঢাকা সিটিতে ভোট কেন কম পড়েছে? সহজ উত্তর হচ্ছে- মার্কিন নাগরিক জাকারবার্গের কারসাজির কারণে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। জাকারবার্গ ইচ্ছে করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও করিৎকর্মা নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করার জন্য এই কাজ করেছেন। কারণ, জাকারবার্গ যদি ফেসবুক আবিষ্কার না করতেন তাহলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ভোটের দিন ভোট দিতে যেত। ইভিএম ভরে ভোট থাকতো। তাহলে নিন্দুকেরা আজকে এ নিয়ে আড়ালে-আবডালে-প্রকাশ্যে-ময়দানে সমালোচনা করে ইসি ও ক্ষমতাসীনদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করতে পারতো না। জাকারবার্গের ফেসবুকের কারণেই তরুণ প্রজন্ম এখন সারাদিন মোবাইলে বুঁদ হয়ে বসে থাকে। আর যে ফেসবুকিং করে সে তো অন্য কোনো কাজ করতে পারে না! সে ভোট দিতে যাবে কেমনে? নির্বাচন কমিশনের সচিব মহোদয় মো. আলমগীর সৃষ্টিশীলভাবেই বলেছেন, ভোটার কম হওয়ার একটা বড় কারণ ফেসবুক। তিনি বলেছেন, ‘জনগণ ছুটি পেয়েছে, অনেকে ছুটি ভোগ করেছে। কেউ কেউ ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত ছিল।’ এরপর নির্বাচনের সময় ভোটারের উপস্থিতি বাড়াতে গাড়ি-ঘোড়ার সঙ্গে ফেসবুকও বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাবটা নির্বাচন কমিশন ভেবে দেখতে পারে! বাংলাদেশ ডিজিটাল হচ্ছে, সুতরাং আমাদেরও নির্বাচন কমিশনের সচিবের মতো ডিজিটালি চিন্তা-ভাবনা পয়দা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অবদান রাখতে হবে! তবে সচিব মো. আলমগীর এই কথাটা কিন্তু মিথ্য বলেননি। ভোটারদের আস্থাহীনতার কারণে এত কম ভোট পড়েছে কি না জানতে চাইলে মো. আলমগীর বলেন, ‘অনাস্থার কারণে যদি ভোটে না যেত, তাহলে যারা সরকারি দল তাদের তো অন্তত ভোটে অনাস্থা নাই। তাদের যদি সব ভোটার ভোট দিত, তাহলেও তো এত কম ভোট পড়ত না। তার মানে হল, তাদেরও অনেক ভোটার ভোট দিতে যান নাই। যারা সরকারকে সমর্থন করেন।’ তার মানে কি এই, ভোট ও ভোটার ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমেও যে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা যায়, সেটা এই নির্বাচন কমিশন জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে? আর এটা অব্যাহত থাকলে একদিন হয়তো মানুষ ভাববে, ভোটেরই যেহেতু দরকার নাই, তাহলে নির্বাচন কমিশনেরই আর কী দরকার?? এটা তুলে দিলেই হয়! কেন্দ্র ‘দখল‘, পাহারা: আচরণবিধি লঙ্ঘণের কথা বাদ দিলে ভোটের প্রচারকাজটা মোটামুটি সুষ্ঠুই চলছিল। বড় ধরনের কোনো হামলা, মারামারি, ভাঙচুরের ঘটনা এই নির্বাচনে হয়নি। ভোটের শেষ দিকে এসে কয়েকটি ছোটখাট ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগ বলতে শুরু করে, বিএনপি ঢাকার বাইরে থেকে লাখ লাখ সন্ত্রাসী এনে ঢাকায় জড়ো করা হচ্ছে। এই সন্ত্রাসীদের দিয়েই কেন্দ্র দখল করা হবে। একজন মেয়র প্রার্থী তো হিসাব দিয়েই বলে দিলেন, বিএনপি ১৭০টি কেন্দ্র দখল করে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপিও বিপুল বিক্রমে প্রচার করা শুরু করলো, উল্টো আওয়ামী লীগই আগের নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতায় এখানে ভোটকেন্দ্র দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। এই কেন্দ্র দখলের প্রচার-প্রপাগাণ্ডা ভাল করেই মিডিয়াগুলো প্রচার করে জনগণের মনে একটা বাড়তি ভীতির সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তো সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দিয়ে দিলেন, বিএনপি যেহেতু কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে ফলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার। ওবায়দুল কাদের বললেন, ‘আমাদেরও দায়িত্ব আছে, জনগণ যেন যাকে খুশি তাকে ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারে। সে ব্যপারে সাংগঠনিকভাবে আমরাও নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিচ্ছি। ... আমরা তো ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য, জনগণকে সহযোগিতা করার জন্য মাঠে থাকব, কারো সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করার জন্য নেতাকর্মীদের কোনো নির্দেশনা দিইনি।’ একপক্ষ কেন্দ্র ‘দখল‘ করবে, আরেকপক্ষ ‘পাহারা’ দেবে- এই দুই পক্ষের ‘সহিংসতা-তত্ত্ব’ ছড়িয়ে ভোটারদের কতোটা ভীতিমুক্ত করা যাবে? ভোটার কেন্দ্রে যায়নি, এর দায় শুধু ভোটারের কাঁধে না চাপিয়ে, যারা ‘সহিংসতা-তত্ত্ব‘ ছড়িয়ে মানুষকে কেন্দ্রে আসতে প্রকারান্তরে নিরুৎসাহিত করেছে তাদেরও কী দায় নেই? লক্ষ্মীর সদয়, সরস্বতীর দোহাই: এবারের ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোট খরচ হয়েছে ৪৩ কোটি ২২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। দুই সিটিতে মোট ভোটার ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। এই হিসাবে ভোটার প্রতি খরচ হয়েছে ৭৯ টাকার বেশি। উত্তর ও দক্ষিণের দুই রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং ৪৩ জন সহকারি রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময় এই ৪৫ কর্মকর্তা অপ্যায়ন খরচ হিসেবে দেখিয়েছেন ২২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এবার ঢাকার দুই সিটিতে ৪৩ কোটির বেশি খরচ হলেও ২০১৫ সালের ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মোট খরচ ছিল প্রায় ২৭ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার ১৮২ টাকা। এ বাড়তি খরচ সম্পর্কে ইসির কর্মকর্তারা জানান, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, অন্যান্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, জনবল বৃদ্ধি, ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব কারণে এবার ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের খরচ বেড়ে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নির্বাচনের সময় কর্মকর্তাদের প্রতি মা লক্ষ্মী খুবই সদয় ছিলেন! তবে সরস্বতী পূজা নিয়ে শুরু থেকেই ঝামেলা চলছিল। প্রথম নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ জানুয়ারি। সেদিন ছিল সরস্বতী পূজা তিথি। ফলে সারাদেশেই আলোচনা-সমালোচনা-আন্দোলন শুরু হয় নির্বাচন পেছানোর। কিন্তু এর মধ্যেও নির্বাচন কমিশন ছিল অনড়। হেন কোনো যুক্তি নাই, যেটা তারা তখন ৩০ জানুয়ারির ভোটের পক্ষে দেওয়ার চেষ্টা করেন নাই। কিন্তু জনগণের চাপে মাথা নত করে শেষ পর্যন্ত ভোটের তারিখ পেছাতে বাধ্য হন। নির্বাচন কমিশনের মাথা নত করার ব্যাপারটা এখানেই শেষ হতে পারতো? কিন্তু ভোটার উপস্থিতি যখনই কমে গেল, তাঁরা যেন অনেকটা প্রতিশোধ-পরায়ণ হয়ে সেই বিষয়টাই আবার সামনে নিয়ে এলেন। অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুঁধোর ঘাড়ে চাপানোর মতো। নির্বাচন কমিশন, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারা পর্যন্ত বলা শুরু করলেন, পূজার কারণে তিনদিন ছুটি ছিল, এই কারণে মানুষ ঢাকা শহরে ছেড়ে চলে গেছে। তাই ভোটার কম হয়েছে। প্রথম কথা, পূজাতে কোনোভাবেই তিনদিন ছুটি ছিল না। ছুটি ছিল একদিন। আর এই ছুটির মধ্যে সরকারি অফিস-আদালত তো খোলা ছিল। দ্বিতীয়ত: দেড় কোটি ঢাকাবাসীর গড়ে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ঢাকা ভোটার। বাকিরা সবাই গ্রামের ভোটার। ফলে ঢাকার ভোটারা ছুটি পেয়ে গ্রামে চলে গেছেন আর গ্রামের ভোটার সব ঢাকায় বসে আছে বা চলে এসেছে কেন্দ্র দখল করতে এই আজগুবি তথ্য বোধহয় কেউ বিশ্বাস করে না। পথে এবার নামো সাথী: আদতে কথা হচ্ছে, যেকোনোভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকতে হবে- এই মতাদর্শ আজকে গোটা বাংলাদেশের সবকিছুকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে হরণ করছে, ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ভঙ্গুর আর ন্যূজ করে দিচ্ছে। কাগজে-কলমে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও নির্বাচন কমিশন সরকারের সিল-প্যাড আর বংশবদে পরিণত হয়েছে। এদের কাছে আর চাওয়ার কিছু নেই। এখন সত্যিকার অর্থেই যদি মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে জনগণকেই রাজপথে নামতে হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
প্রথম পাতা
সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা জীবন-জীবিকাকে হুমকিগ্রস্ত করেছে
‘আর একজন মানুষও যেন বিনা চিকিৎসায় না মরে’
সারাদেশে বিদ্যুতের `ভুতুড়ে বিল’ ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশে সিপিবির ক্ষোভ
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের নয়া ষড়যন্ত্র, বাম জোটের উদ্বেগ-প্রতিবাদ
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সিপিবি’র হুঁশিয়ারি
অপচয় রোধ না করে যারা শিল্প বন্ধ করে তারা ‘গণশত্রু’
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হবে ‘ধ্বংসাত্মক ও আত্মঘাতী’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ প্রগতিশীল ছাত্র জোটের
ভাষা সংগ্রামী ন্যাপ নেতা এম এ রকীবের মৃত্যু, সিপিবির শোক
এক বছরেই নতুন কোটিপতি ৮২৭৬ জন
১৩ মাসের বকেয়ার দাবিতে প্যারাডাইস কেবলসের শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলন

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..