সংসদে ‘ক্রসফায়ারের’ সমর্থন!

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগের মধ্যেই ধর্ষককে ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলার দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। জাতীয় পার্টির একজন সদস্য সংসদে এ প্রস্তাব তোলার পর এক নেতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতাও তাতে সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেছেন, এদের ক্রসফায়ার করলে ‘বেহেস্তে যাওয়া যাবে’, কোনো ‘অসুবিধা হবে না’। গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ‘ধর্ষকদের’ বিচার ছাড়াই হত্যার ওই প্রস্তাব করেন। এক্ষেত্রে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টানেন তিনি। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে চুন্নু বলেন, গেল বছর ১৭ হাজার ৯০০টি নারী নির্যাতনের মামলা হয়। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ জন। ১৮৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭২৭। গেল বছর ধর্ষণের পর ১২ শিশু মারা যায়। নারী মৃত্যু হয় ২৬ জনের। এ বছর ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যায় ১৪টি শিশু। তার মানে বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১৯ সালে ধর্ষণ হয়েছে। ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব, আপনার সরকার, মন্ত্রণালয় এত ঘটনা ঘটছে মাদকের জন্য এত ক্রসফায়ার হচ্ছে সমানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ, জঘন্য ঘটনার জন্য কেন একটা বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় নাই, আমি জানি না। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, এই বিষয়টা সরকার যদি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা না নেয় তাহলে কোনোক্রমেই এটা কন্ট্রোল হবে না,’ বলেছেন তিনি। চুন্নুর ওই প্রস্তাব সমর্থন করে তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে বাংলাদেশে বিচারে দীর্ঘ সময় লাগার কথা তুলে ধরেন একই দলের কাজী ফিরোজ রশীদ। ‘আমাদের কিছু লোক আছে, মাননীয় স্পিকার বলতে বাধা নেই, মানবাধিকার সংগঠন। তারা বলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন- এই ধর্ষকদের কী আইন আপনি করবেন? তার কোনো ফাঁসি হবে না, জেলও হবে না এক সময় এক বছর পর বেরিয়ে যাবে, কেউ খবরও রাখবে না। একমাত্র এই মুহূর্তে যদি এই সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে চান, তাহলে ‘এনকাউন্টার মাস্ট’। তাকে গুলি করে মারতে হবে,’ ভাষ্য এ জাতীয় পার্টির এ নেতার। পরে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা তোফায়েল আহমেদও জাতীয় পার্টির দুই আইনপ্রণেতার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, ‘মাদকের ব্যাপারে যদি সাথে সাথে শেষ করে দেয়, তাহলে মাদকের থেকেও খারাপ জিনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, গার্মেন্ট শ্রমিককে ধর্ষণ করেছে, সুতরাংৃ ভারতে একজন ডাক্তার মেয়ে বাস থেকে নামার পর চারজনে তাকে নিয়ে গণধর্ষণ করেছে। দুদিন পর ক্রসফায়ার দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর ভারতে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি ফিরোজের সঙ্গে একমত। আইন কানুনতো আছেই, তারমধ্যেও একটা চিহ্নিত লোক, ওয়ারির একটা বাচ্চা মেয়ে ছয় বছর বয়স তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। আমাদেরও ছোট নাতি- নাতনি আছে। এটা হতে পারে না।’ ‘এখানে দরকার কঠোর আইন করা। আর দ্বিতীয়ত হল, আমি চিনি যে এ এই কাজ করেছে তার আর এই পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই,’ বলেছেন দীর্ঘদিনের এ সাংসদ। সবশেষে তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, ‘চুন্নু ও কাজী ফিরোজ রশীদ যে কথা বলেছেন, আমি টুপি দাঁড়ি মাথায় নিয়ে আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, এদের ক্রসফায়ার করলে বেহেস্তে যাওয়া যাবে কোনো অসুবিধা নাই।’ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এমনকি বেসরকারি সংস্থাও সংসদে ‘ক্রসফায়ারের’ সমর্থনে সাংসদদের এমন অবস্থানে তাজ্জব বনে গেছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে ‘আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ সমর্থনে আইনপ্রণেতাদের এমন বক্তব্যের খোলামেলা সমালোচনাও করেছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংসদের এমন আলোচনায় ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, ক্রসফায়ারে মেরে ফেললে, আদালত রাখার দরকারটা কি? ‘পুলিশ মহাপরিচালককে তাহলে প্রধান বিচারপতির মর্যাদাও দেওয়া হোক,’ বলেছেন এক ব্যবহারকারী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..