গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন কার স্বার্থ রক্ষা করে?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোহাম্মদ শাহ আলম : দেশে উন্নয়নের রমরমা অবস্থা চলছে। মানুষ উন্নয়ন চায়। সড়ক, ব্রিজ, বিদ্যুৎ, মেট্রোরেল, ট্যানেল হচ্ছে। গড়ে উঠছে অবকাঠামো। বড় বড় মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জনগণ দেখছে, ভালোই। খারাপ কি? দেশতো এগিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু মানুষের মনে প্রশ্ন এর কি কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আছে? এই উন্নয়ন কি পরিবেশবান্ধব, আন্তর্জাতিক মানের, অন্য দেশ থেকে খরচ কম না বেশি। উন্নত দেশ থেকে আমাদের শ্রম সস্তা। এই উন্নয়ন উন্নত দেশ থেকে টেকসই কিনা? এরকম নানা জিজ্ঞাসা মানুষের মধ্যে রয়েছে। উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু পাশাপাশি চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে বালিশের দাম ৬ হাজার টাকা, ফরিদপুর মেডিকেলে পর্দার দাম ৩৭ লাখ টাকা। সড়ক-কালভার্ট দুই তিন বছরও টিকে না। রাস্তার পিচ উঠে যায়, ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে পড়ে। রেল-ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির দাম বাড়ছেতো বাড়ছেই। এখানে দুর্নীতি-অপচয় বন্ধ হয় না। লুট হচ্ছে শেয়ার মার্কেট, পাচার হচ্ছে ব্যাংকের টাকা, বিদেশে সৃষ্ট হচ্ছে বেগমপাড়া। গড়ে উঠছে বানানী-গুলশান-উত্তরা, দখল হচ্ছে খাল-বিল-নদী-নালা। বস্তিতে আগুন লাগছে, লাগানো হচ্ছে, পুড়ছে বস্তি, ভূমিদস্যুদের লোভে। এরা যখন যে সরকার আসে তরল পদার্থের মত তাদের হয়ে যায়। অথবা সরকারি দলের ক্যাডারদের ব্যবহার করে। ছিন্নমূল মানুষ আরো ছিন্নমূল হচ্ছে- বসছে পথে। উন্নয়নের জোয়ারে লক্ষ লক্ষ ইট পুড়ছে- গড়ে উঠেছে নিয়মবহির্ভূত বেআইনি ইট ভাটা-পরিবেশ হচ্ছে বসবাসের অযোগ্য। দূষিত বাতাসে মানুষের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা আর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর নিয়ন্ত্রিত। উন্নয়নটা সামগ্রিক কিনা? অর্থাৎ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও কলকারখানা গড়ে তুলছে কিনা? স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতের কি অবস্থা? কোথায় কত বরাদ্দ? বরাদ্দের নীতি-দৃষ্টিভঙ্গি কি? উন্নয়ন সুষম না উগ্র। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব কিনা? আমরা দেখছি উন্নয়নটা সামগ্রিক-পরিকল্পিত নয়। স্বতঃস্ফূর্ত, নৈরাজ্যিক : নৈরাজ্যিক এই কারণে সরকারের কাজের বহু বিভাগ, কিন্তু বিভাগগুলির কাজের কোনো সমন্বয় নেই। ফলে সময়ক্ষেপণ-অপচয়-দুর্নীতি-বাজেট ও খরচ বৃদ্ধি হচ্ছে। দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতাই যেন পরিকল্পিত। দেশে চলছে Jobless উন্নয়ন। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকার। উন্নয়নে দুর্নীতি, অপচয়-দীর্ঘসূত্রিতা বাড়াচ্ছে মানুষের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা। সরকারের সেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে টেন্ডারবাজ জি. কে. শামীমদের ধন বাড়ছে রকেটগতিতে, তাদের আছে প্রাইভেট বাহিনী। তাদের হাতে থাকে, আইনি-বেআইনি অস্ত্র, হচ্ছে তারা ধনকুবের। এদের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ মওকুফ হয়ে যায়। উন্নয়ন সুষম নয়, ফলে সমাজে শ্রেণি বৈষম্য-ধনবৈষম্য বাড়ছে। কেন এমন হচ্ছে? এটা কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। চলছে বহু দিন ধরে। সরকার বলছে উন্নয়ন চান না গণতন্ত্র চান? উন্নয়ন চাইলে গণতন্ত্রহীনতা হজম করতে হবে। সরকার উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পরস্পরের পরিপূরক-সাংঘর্ষিক নয়। গণতন্ত্র হচ্ছে Sustainable development -এর গ্যারান্টি। উন্নয়ন চাই দুর্নীতিমুক্ত, অপচয়মুক্ত উন্নয়ন– ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট, বিদেশে টাকা পাচার মুক্ত উন্নয়ন, বিলাসমুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির উন্নয়ন। স্বচ্ছ-জবাবদিহির উন্নয়ন। গণতন্ত্রহীনতা কি উন্নয়নে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে? অবশ্যই নয়। সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, ব্যাংকের টাকা লোপাট করছে। মানুষের উপর করের বোঝা- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী এখন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৬১টি স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থার ব্যাংকে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমার বিধান করছেন। এটা তবলিকি কর্মকাণ্ড। কিন্তু বিদেশে পাচারকৃত লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করছেন না, ধনী উপর প্রত্যক্ষ করের সিলিং বাড়াচ্ছেন না। অর্থনীতিকে ফেলেছেন গিরিখাদে, আনছেন নৈরাজ্য। এই নীতি-আদর্শ-দৃষ্টিভঙ্গি কাদের স্বার্থে? ব্রিটিশ আমল–পাকিস্তান আমলেও দুর্নীতি ছিল। কিন্তু এতো খোলামেলা, প্রকাশ্যে ঘুষ-পারসেন্টেজের দাবি ছিল না। রাজনীতিতে কিছু নীতি-নৈতিকতা ছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রকাশ্য লুটপাটের হাতিয়ার ছিল না। গত ২০১৮ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণহীন। স্বাধীনতার পর বাজার কারসাজির মাধ্যমে যে বাণিজ্য পুঁজি গড়ে উঠেছিল– তা এদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে কিভাবে লুটপাট করেছে– তা এদেশে গজিয়ে উঠা বিভিন্ন পুঁজিপতি গ্রুপের জন্মবৃত্তান্ত দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায়। যখন ১৯৭৫-এর পর সামরিক শাসন আমলে শিল্প-কারখানা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফেরত দেয়া শুরু হয়, তখন একটি ৫০০ টাকার সিলিং ফ্যানের দাম ধরতে দেখা যায় এক টাকা। কি অবিশ্বাস্য হরিলুট। দেশে গণতন্ত্র-গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থাকলে এই অবাধ লুণ্ঠন সম্ভব ছিল না। থাকতো ভয়, ভীতি ও জবাবদিহিতা। তাই আমরা দেখি স্বৈরাচার এরশাদসহ সামরিক-বেসামরিক আমলা নব্য রাজনীতিবিদদের বিদ্যুৎ গতিতে ধনবান হতে। সংসদ-উপজেলা-সিটি কর্পোরেশন-পৌরসভা-জেলা পরিষদ-ইউনিয়ন পরিষদ কোথাও জনগণের নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ জনগণের ভোটে এদের নির্বাচিত হতে হয় না। ফলে জনগণকে এরা তোয়াক্কা করে না। নিয়ন্ত্রণ লুটেরা পুঁজি, দলীয় ক্যাডার ও আমলাদের। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠানে এমনকি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে চলে ভাগ-বাটোয়ারার রাজনীতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নির্মাণের ঘটনা তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। উন্নয়ন, বাজেট ও বরাদ্দের টাকা লোপাট করার জন্য লুটেরা, আমলা ও social criminal-দের এক পাপচক্র গড়ে ওঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে সমাজ ও রাজনীতিতে। সব সরকারের আমলে এরা আছে। যখন যে সরকার আসে তখন তাদের অনুসারীদের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। বাজার অর্থনীতিতে দুর্নীতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন। দেশে গণতন্ত্র চালু থাকলে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি যদি মানুষের ভোটে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়, দুর্নীতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা সৃষ্টি হয়। থাকে জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমীহ মনোভাব। জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার ভয় থাকে সব সময়। আমলারা থাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। তাই, আমরা দেখছি গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, লুটপাট, গোষ্ঠীতন্ত্র, আমলা ও মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করেছে। উন্নয়নের প্রত্যক্ষ ফল ভোগ করছে এরা। এদের স্বার্থ রক্ষা করছে সরকার ও রাষ্ট্র। দেশ-বিদেশে পরিশ্রম করে, উন্নয়নের ভার বহন করতে হচ্ছে এদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকে। সামরিক শাসন, স্বৈরাচার অবাধ লুটপাটের সহায়ক। গণতন্ত্রহীন ও জবাবদিহিতাহীন উন্নয়ন লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করে। গণতন্ত্র এদের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে গণতন্ত্র এদেশে বার বার নির্বাসনে যায়। তাই আজ সমাজের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে করতে হবে জোরদার। গণতন্ত্রকে আমলাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে তৃণমূল পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে মানুষের কাছে জবাবদিহিতায় নিয়ে আসতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..