দখল হয়ে যাচ্ছে ওয়াকফ এস্টেটগুলো

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
বগুড়া সংবাদদাতা : বৃহত্তর বগুড়ার (বগুড়া-জয়পুরহাট) ওয়াকফ এস্টেটগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। দখলকারীদের বড় একটি অংশ ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লি। এর বাইরেও এক শ্রেণির ভূমিগ্রাসী ওয়াকফ সম্পত্তি জোর করে দখলে রেখেছে। আরেক দিকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা ওয়াকফ সম্পত্তি কৌশলে কম দামে কিনে নিচ্ছে। এজন্য তারা ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মচারীদের হাত করে কম ভেল্যুয়েশনের কাগজ তৈরি করে নিচ্ছে। সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বহু অঙ্কের রাজস্ব থেকে। বগুড়া ও জয়পুরহাটে আছে ১ হাজার ১শ’ ৮৮টি ওয়াকফ এস্টেট। এই খাতে জমির পরিমাণ অন্তত ৪২ হাজার একর। এর মধ্যে প্রজাবিলি ভূমির পরিমাণ ৩৫ হাজার একর। অর্থাৎ ওয়াকফকারী এই পরিমাণ ভূমি তাদের ওয়ারিশদের বর্গা করে দিয়েছেন অথবা দান করেছেন। বাকি ৭ হাজার একর ভূমি ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে রাখা হয়। এই ভূমিরও দুই হাজার একরেরও বেশি বেদখল হয়ে গেছে। ওয়াকফ সম্পত্তির সরকারিভাবে প্রদেয় রাজস্বের অংশের অন্তত ৫০ লাখ টাকা পাওনা হয়ে আছে। কর্তৃপক্ষের কথা : লোকবলের অভাবে তদারকি করা যায় না। যেটুকু তদারকি হয়েছে সেগুলোতে অনিয়ম পাওয়ার পর মামলা দায়ের করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে বেচাকেনার বিষয়ে তাদের কোনো সদুত্তর নেই। এই ধরনের বেচাকেনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না এই বিষয়ে কোনো উত্তর মেলে নি। দেশের সকল ওয়াকফ সম্পত্তির দেখভাল করে সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন। মাঠপর্যায়ে একজন পরিদর্শকের অধীনে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে চলছে নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম। বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার ওয়াকফ ভূমি দেখভাল করেন দুই পরিদর্শক। সূত্র জানায়, ভূমিগ্রাসী চক্রের সঙ্গে ওয়াকফ প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মচারীর সখ্য রয়েছে। তারাই বলে দেয় কিভাবে কোন ফাঁক ফোকর দিয়ে ওয়াকফ সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়া যায়। বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকায় পীর আজিজুল্লাহ (র) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের তিনটি পুকুরসহ প্রায় ১৭ বিঘা জমি বেদখল হয়ে গিয়েছে। দুপচাঁচিয়া হিরঞ্জা এলাকার দমশের তালুকদার ওয়াকফ এস্টেটের ৬৩ একর ভূমির মধ্যে প্রায় ২৬ একর জমি দখল হয়েছে। অভিযোগ মেলে যাদের কাছে সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারাই দখল করেছে। এই এস্টেটে সরকারি অংশের প্রদেয় রাজস্ব বকেয়া রয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। সূত্র জানায়, অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই এস্টেটের মোতওয়াল্লিকে বাতিল করে সরকারের প্রতিনিধি (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) দায়িত্ব পেয়েছেন। গাবতলির গোড়াদহ এলাকায় ছমির উদ্দিন সরকার ওয়াকফ এস্টেটের ৬১ একর সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৪৫ একর বেদখল হয়ে গেছে। বগুড়া শহরে বৃন্দাবনপাড়ায় মুন্সী নাসির উদ্দিন মণ্ডল ওয়াকফ এস্টেটের অর্ধেক ভূমি দখল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে বগুড়ার নওয়াব এস্টেটের ওয়াকফ ভূমি ও স্থাপনা। এই এস্টেট তদানীন্তন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর পূর্বপুরুষের। বংশানুক্রমে তাদের পরিবারের সদস্য মোতওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করেন। নিকট অতীতের পূর্বপুরুষ সোবাহান চৗধুরী তার স্ত্রী তহুরুন্নেছা থেকে পরবর্তী বংশধরেরা জমিদারি ও নওয়াবী খেতাবপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ভোগ দখল করতে থাকেন। চতুর্থ বংশের ছিলেন মোহাম্মদ আলী। তার আগের বংশধর বেশ কিছু জমি শিক্ষা ও মানবকল্যাণে ওয়াকফ করেন। মোহাম্মদ আলী মারা যাওয়ার পর বৈমাত্রেয় ভাই ও শরিকগণের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির বেচাকেনার পালা শুরু হয়। বৈমাত্রীয় দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পর মোহাম্মদ আলীর তিন ছেলে এক মেয়ে দায়িত্ব পান মোতওয়াল্লির। ওয়াকফ এস্টেট বেচাকেনার পালা শেষ হওয়ার পর তাদের বসতভিটার অংশ বেচাকেনা শুরু হয়। বসতভিটার ধারে যে বিশাল ভূমি ওয়াকফ করা আছে তার সবই নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিক্রি হয়েছে। যেখানে বহুতল মার্কেট নির্মিত হয়েছে। মোহাম্মদ আলীর তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে তাদের বসতভিটার যে অংশটুকু এখনও টিকে আছে তা রক্ষায় সরকারকে অধিগ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। সরকার এই অংশটুকু ঐতিহ্য রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরকে দিয়েছে। নওয়াবের এই ওয়াকফ সম্পত্তি বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথা থেকে সামান্য পূর্বে। এদিকে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর মুকিমপুর এলাকার চৌধুরী ওয়াকফ এস্টেটের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি দখল হয়ে গিয়েছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..