ধর্ষণ বেড়েছে ‘দ্বিগুণ’

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা ফিচার ডেস্ক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চলছে। খোদ রাজধানীর একটি ব্যস্ততম মহাসড়কের পাশে এই ধর্ষণের ঘটনা সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন প্রতিদিনই প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এই ঘটনা নিয়ে বিক্ষোভ হচ্ছে। এরই মধ্যে মজনু নামের এক ব্যক্তিকে এই ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তারা দাবি করেছে এই মজনু একজন সিরিয়াল রেপিস্ট। র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। র্যাবের মাধ্যমে এটাও জানা গেছে নির্যাতনের শিকার ছাত্রীও মজনুকে ধর্ষক বলে চিহ্নিত করেছে। মজনুকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহের সৃষ্টিও তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই বলছেন এ আরেক ‘জজ মিয়া’ নাটক নয়তো? মজনু কি সত্যিই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত? নাকি পরিস্থিতি সামাল দিতে মজনুকে বলির পাঠা বানানো হয়েছে? জনমনে যে আলোচনা-সামালোচনাই থাক না কেন আমাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের ওপরেই নির্ভর করতে হবে। তবে বাংলাদেশে যে দিনের পর দিন ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এটা নিয়ে জনমনে এক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের কোনো জায়গাই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। ধর্ষণ ও গণধর্ষণের হাত থেকে তিন বছরের একটি শিশুও নিরাপদ নয়। শুধু মেয়েরাই নয়, বিভিন্ন স্থানে ছেলে বাচ্চারাও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। সচেতন সমাজ বলছেন এই ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও হত্যা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে তনু হত্যার রহস্যের জট এখনো খুলেনি। সাংবাদিক রুনি হত্যা হয়তো একদিন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই ধর্ষকরা প্রশয় পাচ্ছে। বর্তমানে নারী নির্যাতন একটি মামুমি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আদিম ও অসভ্য যুগের মতোই নারীরা নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। মেয়েদের জন্য এই জনপদ দিনকে দিন একটি ত্রাসের রাজ্যতে পরিণত হচ্ছে। বাস-ট্রেন, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ কোনো জায়গাই আজ নারীর জন্য নিরাপদ নয়। এরই মধ্যে গেল ৩১ ডিসেম্বর আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আসকের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৯ সালে দেশে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী এবং ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮১৮। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০১৯ : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন আসক কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে আসকের তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। আসকের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নিনা গোস্বামী প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বিদায়ী বছরে ৩৮৮ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। গুমের অভিযোগের সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও বছরজুড়ে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মধ্যে নারী ধর্ষণ, দল বেঁধে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হতাহতের ঘটনা অনেক। বছরের মাঝামাঝি ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অনেক নিরীহ মানুষ। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীদের উত্ত্যক্ত করা ও যৌন হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯ সালে ২৫৮ জন নারী যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৪ পুরুষ। উত্ত্যক্ত হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১৮ নারী। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়েছেন চার নারীসহ ১৭ জন। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯-এ শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও নিখোঁজের পর মোট ৪৮৭ শিশু নিহত হয়েছে। ২০১৮-তে এ সংখ্যা ছিল ৪১৯। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে এ বছর নিহত হয়েছে ১৮৭ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর হেফাজতে ১৪ জন মারা যান। গ্রেপ্তারের আগে নির্যাতনে মারা যান ছয়জন এবং গুলিতে নিহত হয়েছেন আরও ১২ জন। এ বছর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৩৭ জন এবং তাদের শারীরিক নির্যাতনের কারণে ছয় জনসহ ৪৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া ২০১৯ সালে ১৪২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়েন। গত বছর দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় ৭২টি প্রতিমা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩৯টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে আহত হয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫১ ব্যক্তি। বিদায়ী বছরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে শারীরিক-মানসিকসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারী শ্রমিকরা। আসক সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো- এ পর্যন্ত সংঘটিত সব গুম, অপহরণ ও ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে সহযোগিতা দিতে হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..