গণিতজ্ঞ হাইপেশিয়া অবিস্মরণীয় এক নাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তুহিন কান্তি ধর : হাইপেশিয়া (৩৭০-মার্চ ৪১৫) ছিলেন বিখ্যাত মিশরীয় দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ। নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম উল্লেখযোগ্য গণিতজ্ঞ। শিক্ষক হিসেবেও তাঁর সাফল্য উল্লেখ করার মতো। হাইপেশিয়ার জন্ম আনুমানিক ৩৭০ সালে। তাঁর পিতার নাম থিওন। তিনিও একজন খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক ছিলেন এবং হাইপেশিয়াকে মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণে তাঁর ভূমিকাই ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। ৪০০ সালের দিকে হাইপেশিয়া মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়ার নব্য প্লেটোবাদী দর্শনধারার মূল ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং খ্যাতির চরম শিখরে আরোহণ করেন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ বাগ্মীতা, বিনয় এবং সৌন্দর্য্যের সার্থক সম্মিলন ঘটেছিল। এজন্য তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর আকর্ষণ লাভ করতে সমর্থ হন। ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখক ও সাহিত্যিকেরা তাঁকে সৌন্দর্য্যের দেবী এথেনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি শিক্ষা এবং বিজ্ঞানকে সঠিক উপমার মাধ্যমে প্রতিকায়িত করেন। সুডা লেক্সিকন নামক দশম শতাব্দীর একটি বিশ্বকোষের বর্ণনামতে তিনি কয়েকটি পুস্তকের উপর ভাষ্য রচনা করেন। এই বইগুলো পরে আর পাওয়া যায়নি। তবে এরিথমেটিকা বইটির বর্ধিত আরবি সংস্করণে তাঁর ভাষ্য সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক একটি সারগ্রন্থের উপর তিনি ভাষ্য রচনা করেন। হাইপেশিয়া নিজেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতের চর্চায় উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল তৎকালীন যুগের সাপেক্ষে অনেক পরিপক্ক ও বৈজ্ঞানিক এবং তার মাঝে পৌরাণিকতা ছিল না বললেই চলে। যদিও তাঁর দর্শন সম্বন্ধে কোনো সুস্পষ্ট দলিল বর্তমানে অবশিষ্ট নেই। হাইপেশিয়ার রূপ-সৌন্দর্য্য তাঁর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে একীভূত হয়ে তাঁকে অপূর্ব মহিমা দান করেছিল। তাই তৎকালীন যুগে তিনি এতোটা বিখ্যাত হয়েছিলেন। এর সাথে তাঁর করুণ মৃত্যু যোগ হয়ে তাঁকে অমরত্ব দান করেছে। তাঁর জীবন তাই অনেক লেখককেই উৎসাহিত করেছে। তাঁর জীবনী নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল চার্লস কিংসলির লেখা ‘হাইপেশিয়া’। হাইপেশিয়ার নব্য প্লেটোবাদী মতবাদে বিশ্বাস, খ্রিস্টান শাসকদের শঙ্কার কারণ ছিল। তাঁরা হাইপেশিয়ার দর্শনকে মনে করতেন চার্চদ্রোহী। তৎকালীন খ্রিস্টান শাসিত সমাজে হাইপেশিয়া ছিলেন প্যাগান গোত্রের। আরেক প্রাচীন ধর্ম প্যাগানিজম এর ধারক। ৪১২ সালে আলেক্সান্দ্রিয়ার ঊর্ধ্বতন যাজক হিসেবে ‘সিরিল’ যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি পরিকল্পিতভাবে চার্চদ্রোহীদের দমন এবং ধ্বংসাত্মক কাজ শুরু করেন। ৪১৪ সালে আলেক্সান্দ্রিয়ায় ইহুদী বিতাড়ণের সূচনার মাধ্যমে বিপর্যয়ের ঘনঘটা দেখা দেয়। হাইপেশিয়ার যে প্রভাব ছিল তখনকার সমাজে তাতে ভয় পাওয়া শুরু করেন সিরিল। তিনি মনে করেন হাইপেশিয়া চার্চের জন্য বড় হুমকি। তাঁর প্রতি মানুষের সম্মান, অনুগামিতা চার্চপন্থিদের মধ্যে ধর্মীয় সংকীর্ণ রাজনীতির সূচনা করে। ধর্মীয় কলহের ছোবল পড়ে হাইপেশিয়ার উপর। এসবের ধারাবাহিকতায় ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টান জনতার হাতে হাইপেশিয়া ভয়ংকরভাবে নিহত হন। ইতিহাসের বর্ণনামতে, ৪১৫ সালে মার্চের এক সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পথে সিরিল এর লেলিয়ে দেয়া একদল সন্ত্রাসী হাইপেশিয়াকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় চার্চ সিজারিয়ামে। ঝিনুকের খোল দিয়ে তাঁর দেহের চামড়া চেঁছে ফেলা হয়। এখানেই থেমে থাকেনি তথাকথিত ধার্মিক সন্ত্রাসীদের দল। তাঁর মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল তারা। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি! স্বৈরাচারী শাসকদের চরিত্র সবসময় একই ধরনের- আজকের ইতিহাসও তাই সাক্ষ্য দেয়। শুধু তাই নয়, ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টান জনতা সম্মিলিত আক্রমণের মাধ্যমে ‘আলেক্সান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার’ও ধ্বংস করে দেয়। আর এতে করেই তাঁর লিখিত পুস্তক-দলিলসহ তৎকালীন যুগের সেরা বৈজ্ঞানিক গবেষণাগ্রন্থ এবং হাজার হাজার মূল্যবান গ্রন্থ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অনেক বিশেষজ্ঞই হাইপেশিয়ার মৃত্যুকে প্রাচীন আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্র আলেক্সান্দ্রিয়ার পতনের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হাইপেশিয়ার দু’টি বিখ্যাত উক্তি থেকে তাঁর দর্শনের অকাট্যতা প্রতিভাত হয় : ১) তোমার চিন্তা করার অধিকার সংরক্ষণ কর। এমনকি ভুলভাবে চিন্তা করা, একেবারে চিন্তা না করা থেকে উত্তম। ২) কুসংস্কারকে সত্য হিসেবে শিক্ষা দেয়া একটি ভয়ংকরতম বিষয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..