ধর্ষণ বন্ধে প্রয়োজন রাজনৈতিক উত্তরণ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মামুন কবীর : চারিদিকে শুরু হয়েছে ধর্ষণের মহামারি। সামাজিক বিকৃতির এক চরমতম সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এ সমাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণ, পোশাককর্মী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধা কেউ বাদ যাচ্ছে না বিকৃত মস্তিষ্কের ধর্ষণ মানসিকতা থেকে। কেউ কেউ ফেসবুকে আবার কেউ কেউ ছোটখাটো আকারে সংগঠিত প্রতিবাদও জানাচ্ছেন। তাদেরকে সাধুবাদ। অপরাধ সংঘটিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এভাবে সমাজ-রাষ্ট্র সবাই এসে দাঁড়াবে এটাই কাম্য। কিন্তু অপরাধ যাতে না হয় তার জন্য আমরা কী করছি? পাঁচ বছরের একটা শিশু ধর্ষণের শিকার কেন হলো? কেন চলিশোর্ধ পুরুষ পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে? আমরা দেখেছি এর আগেও এর চেয়ে কম বয়সের শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধাও। কিন্তু কেন? প্রতিদিনই ধর্ষণ হয়, হতেই থাকে। আমরাও প্রতিবাদী হতেই থাকি ঘটনা ঘটে যাবার পরে। রাষ্ট্র তৎপর হয়। অপরাধী গ্রেফতার হয় কিংবা হয় না। অপরাধীর শাস্তি হয় অথবা হয় না। তারপর আবার ধর্ষণ। মানবসমাজে ধর্ষণ কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু তারপরও হয়। কারণ আমরা ধর্ষকামী মানসিকতার পরিবর্তনে কোনো কাজ করি না। না করে সমাজ আর না করে রাষ্ট্র। আর আমাদের সমাজে পরিবার এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলো হলো রক্ষণশীল। একজন ছেলেশিশু যাতে ভবিষ্যতে ধর্ষক না হয়ে ওঠে সেই শিক্ষা আমাদের সমাজে পরিবারগুলো দিতে পারে না তাদের রক্ষণশীলতার কারণে। তবে একজন ছেলেশিশু যাতে নিপীড়ক হয়ে গড়ে উঠতে সক্ষম হয় সেই শিক্ষা সে পরিবার এবং সমাজ ?দুই জায়গা থেকেই পায়। প্রতিনিয়ত একজন ছেলেশিশু তার পরিবার ও সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিকতা চর্চার প্রশিক্ষণ পায় আর পাশাপাশি দেখে নারীর অধস্তনতা। এভাবেই সে হয়ে উঠে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতাবান। টের পায় পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে সে গর্বিত, সমাজে তার ক্ষমতা কতখানি। আরো বুঝতে পারে পুরুষতান্ত্রিকতা চর্চায় এবং টিকিয়ে রাখায় তার দায়িত্ব কী। ধীরে ধীরে সে-ও হয়ে উঠে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি। আমাদের দেশের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে সকলে মিলে অপরাধ কিংবা সমস্যার নানান ধরন এবং স্তর নির্ধারণ করেছেন। স্বামী তার স্ত্রীকে পেটালে সেটা পারিবারিক সমস্যা। ধর্ষণ হলে সেটা সামাজিক সমস্যা। রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া-না যাওয়া কিংবা থাকা-না থাকার বিষয় হলে সেটা রাজনৈতিক সমস্যা। ফলে একজনের সমস্যায় অন্যজন কথা না বলে চুপচাপ থাকে। আর একজনের ব্যাপারে অন্যজন কথা বললে তা হস্তক্ষেপ কিংবা নাক গলানো বলে ভাবা হয়। এখানে রাজনীতি করেন রাজনৈতিক দল আর সমাজ নিয়ে কথা বলে এনজিও। তাই এনজিওগুলোর রাজনীতির বিষয়ে কোনো কথা বলা মানা। আর সামাজিক সমস্যা বলে যে সকল বিষয় চিহ্নিত তা নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং তাদের নেতৃবৃন্দ চুপচাপ থাকেন। কেউ কারো দায় নিতে চায় না আবার দায়িত্ব ছাড়তেও চায় না। তাই ধর্ষণ হলে রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ কোনো কথা বলেন না। কারণ তাদের অন্য আরো অনেক এজেন্ডা রয়েছে। একজন নারীকে ধর্ষণ করা হলো পুরুষতান্ত্রিকতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। নারীকে শিক্ষা দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে পুরুষতন্ত্রের কর্তৃত্ব জাহির করা। পুরুষালি সমাজে পুরুষকেই নারীর সকল দায়িত্ব অর্পণ করা আছে। সুতরাং পুরুষ নারীকে যা খুশি তাই করতে পারে এমন একটি মানসিকতা নিয়েই সে বেড়ে উঠে। শহর কিংবা গ্রামে একটা প্রবাদ প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ‘আরে জেল-হাজত তো পুরুষ মানুষের জন্যই।’ প্রবাদটি বলবার উদ্দেশ্য হলো পুরুষ মনেই করে যে, সেই সমাজে ক্ষমতাবান। ফলে সকল অন্যায় করার দায়িত্ব তার ওপর ন্যাস্ত আছে। তাই বিচার হবে শুধু পুরুষেরই আর তাতে জেল-হাজতে যাবে শুধু পুরুষেরাই। এগুলো হলো পুরুষালি সমাজের মনস্তত্ত্ব। এমন মানসিকতা নিয়ে যদি একটি শিশু বেড়ে ওঠে তবে তার পক্ষে ধর্ষক হয়ে উঠা অবাক হবার মতো বিষয় নয়। দিনাজপুরে শিশু ধর্ষণ, ইয়াসমিন হত্যা, তনু হত্যা, আফসানা হত্যা, খাদিজাকে নৃশংসভাবে কোপানো কিংবা বিসিআইসি কলেজের ছাত্রী যমজ বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় পেটানো সবই এই পুরুষালি মনস্তত্ত্বের ফলাফল। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সমাজ থেকে পুরুষালি মনস্তত্ত্ব দূর করে এটাকে সহিংসতামুক্ত করার উপায়টা তাহলে কী হতে পারে তা অবশ্যই ভাবনার দাবি রাখে। আমাদের সামনে আছে কিছু গৎবাঁধা কথা আর কিছু গৎবাঁধা কাজের নমুনা। যা আসলে সাময়িক উপশম। আমরা সকলেই জানি ইংরেজিতে একটি কথা আছে, চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব. কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতাসহ অন্যান্য সকল ধরনের সহিংসতা দূরীকরণে আমরা প্রিভেনশনের কথা মনেই রাখি না। আমরা শুধু উপরে উপরে বার্নিশ করে চকচকে তকতকে রাখার চেষ্টা করি আমাদের জীবনটাকে। কিন্তু এটা কি আদৌ কোনো সমাধান? নারী এই সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবারে যত ধরনের সহিংসতার শিকার হয় তা সাধারণত তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী ব্যক্তির দ্বারাই হয়ে থাকে। পুরুষ নারীর চেয়ে ক্ষমতাবান হবার কারণে পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনের শিকার হয়, সেটা পরিবার-সমাজ কিংবা রাষ্ট্র যেখানেই হোক না কেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, নারী আর পুরুষের সম্পর্কটা হলো ক্ষমতার সম্পর্ক। সমাজ কিংবা রাজনীতি নিয়ে কাজ করার সুবিধা যারা ভোগ করেন তারা স্বীকার করুন আর নাই করুন সকল ধরনের ক্ষমতার সম্পর্কই আসলে রাজনৈতিক ইস্যু। আমাদের পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে রাজনীতির বাইরে কিছুই নাই। আমার জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে উঠা, জীবন-যাপন, জীবনাচরণ, সম্পর্ক, আমাদের সংস্কৃতি প্রত্যেকটি বিষয়ই রাজনৈতিক। অনেকেই অস্বীকার করতে পারেন। তারা মনে-প্রাণে ধারণও করেন যে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহই হলো রাজনৈতিক বিষয়। বাকিগুলো অন্যান্য এবং সংশিষ্ট। যেমন পরিবারে হলে পারিবারিক, সমাজে হলে সামাজিক ইত্যাদি। সমাজ পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব আসলে রাজনৈতিক দলের তথা রাজনীতিকের। কিন্তু আমাদের দেশের ডানপন্থি বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই দায় স্বীকার করতে চায় না অথবা অন্যেরা এই দায় তাদের কাছে নিতেও চায় না। অথচ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সামাজিক অঙ্গীকার দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সমাজে নারী এবং শিশুরা পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। একজন মেয়েশিশুকে যতই শিক্ষা দেয়া হোক যে বাল্যবিবাহ খারাপ, এটার অনেক ক্ষতিকারক দিক আছে, এটি আইনত নিষিদ্ধ তাতে আসলে খুব একটা কাজ হয় না। পরিবারের কর্তা যখন পিতা আর তিনি যখন তার কন্যার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন তখন আর ওই অঙ্গীকারাবদ্ধ মেয়েটার কিছুই করার থাকে না। সুতরাং সমস্যা তৈরি হয় যার দ্বারা তার রাজনৈতিক চেতনার ঘাটতি রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়, আর তিনি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধও নন। ক্ষমতা থাকলেই একজন মানুষ সহিংস হয়ে উঠবেন এমন কোনো কথা কোথাও লেখা নেই। হাতে ক্ষমতা পেয়েও নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের ওপর প্রতিশোধ নেননি। তিনি তাদেরকে বর্ণবাদী নিপীড়নের জন্য অনুতাপ করে ক্ষমা চাইবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এতে ম্যান্ডেলার ক্ষমতা এক ফোটাও খর্ব হয়নি। আর তাঁর সম্মানও ক্ষুণ্ন হয়নি। বরঞ্চ তিনি আরো সম্মানিত হয়েছেন মানুষের মাঝে। মানুষ যদি তার মানবীয় চেতনায় শাণিত হন, যদি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হন তবে অবশ্যই নারীর প্রতি সহিংসতাসহ সকল ধরনের সহিংসতা দূর হবে। ক্ষমতাবান পুরুষের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। মানুষ মানে মমত্ববোধ, মানুষ মানে দায়িত্ববোধ- এই মর্মে অঙ্গীকার জরুরি। প্রয়োজন রাজনৈতিক উত্তরণ। এই রাজনৈতিক উত্তরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশের যুব সমাজ। যুব সমাজের চেতনা সুস্থ ধারার মানবিক চেতনাসমৃদ্ধ হলে তারাই পারবে রুখে দাঁড়াতে। পেশীশক্তির রাজনীতি চর্চা, ক্ষমতার দাম্ভিকতায় ভরা রাজনীতি আমাদের সমাজের যুব সমাজকেও করে তুলছে কলুষিত। কিন্তু যুব সমাজের সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা সমাজকে দিতে পারে এক নতুন চেতনার দিক নিশানা। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি বৃদ্ধি করা যায় তবেই বন্ধ হবে ধর্ষণের মতো মানসিক বিকৃতি। কলুষমুক্ত হবে আমাদের এ সমাজ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..