গ্রাম বাংলার পথ ধরে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আহমদ সিরাজ: কে কোন আয়তনে, গ্রামে না শহরে বসবাস করেন তা নয়, তার চেয়েও বড় সত্য হচ্ছে যেকোনো অবস্থান থেকেও স্বদেশ ও সমাজকে বুঝে নেয়ার সুযোগ আছে। তেমন একটা সত্যকে বহন করে ১৯ ডিসেম্বরের সকালে কনকনে শীতের মধ্যে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু,শাহ্ অলিদসহ একটি অটোরিক্শায় চড়ে কমলগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনা থেকে রওয়ানা দিয়েছি তিলকপুর, আদমপুর, নৈনারপার হয়ে মধ্যভাগে- একজন বাবুল মাস্টার যুক্ত হওয়ায় আমাদের যাত্রা হয়ে যায় কাঠালকান্দি গ্রামের দিকে, আধাপাকা, কাঁচাভাঙা রাস্তা দিয়ে। অটোরিক্শা থেমে থেমে যেন এগিয়ে চলতে গিয়ে চারপাঁচ কিলোমিটারের রাস্তা হয়ে উঠে বহুদূর, পথ সহসা শেষ হয় না। দুপাশে ধানি জমি। ধানকাটা প্রায় সারা হয়ে গেছে। লক্ষ্য দেশীয় হাতে তৈরি খৈ-মুড়ি দেখা এবং সাংবাদিকের চোখ দিয়ে বুঝে নেয়া- মুড়ি এখন মেশিনে তৈরি হলেও এই গ্রামের কিছু লোকজন কীভাবে হাতে মুড়ি তৈরি করে সুফল পেয়ে উঠেছেন, তারা এতদিন কীভাবে মুড়ি তৈরির সনাতন পদ্ধতি ধরে রেখেছেন এই আগ্রহবোধ আমাদের তাড়া করছিল। তাদের ওখানে গিয়ে পৌঁছুতেই আমাদের চোখে পড়ে উঠোনের টুকরিতে রাখা মুড়ি ও মুড়ি ভাজার শব্দ। আমাদের ইচ্ছার কথা জানানো হলে তারা যে মুড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত এমন বার্তা জানাতে নারাজ। জীবনের প্রয়োজনে তারা মুড়ি তৈরি করেন, বাজারে বিক্রি করেন, কিন্তু তা দেশে খবর হয়ে উঠুক, তা চান না। এই কাজ করে তারা বেঁচে আছেন ঠিকই কিন্তু এই কাজটি সংসারের জন্য সুনাম বহন করে বলে মনে করেন না। মুড়ি তৈরির বার্তা খবর হয়ে উঠলে প্রজন্মের শিক্ষিত সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সুখবর হয়ে উঠবে বলে মনে করেন না। তাদের দেশজ মুড়ি এতদঞ্চলে সুনাম বহন করছে, তেমন গুরুত্ব আরোপ করলেও তারা একযোগে তেমন বার্তায় কলেজ পড়ুয়া পুত্রকন্যার বিয়েশাদিতে গুরুত্ব করবে না বলে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করাতে আর কোনো তথ্যই জানা যায়নি। আমাদের পথ পাল্টাতে হয়। অগত্যা এখান থেকে মধ্যভাগ বাজারে ফিরে এসে- শ্রীপুর হয়ে মূল রাস্তা থেকে পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে পাত্রখোলার দিকে প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার দূরে যাত্রা করি। আমরা পাত্রখোলা বাংলার অদূরে অটোরিকশা থেকে নেমে বিরাট টমেটো বাগানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি। এখানে বস্তির গরিব বাঙালিরা চা বাগানের জমিন কেদার প্রতি ৪/৫ হাজার টাকায় বছরের জন্য ভাড়া করে নিয়ে টমেটো চাষ করছেন। এখানে প্রায় ৩০ জন টমেটো চাষি প্রায় শত কেদার জমিতে টমেটোর চাষ করে, গত ভাদ্র মাস থেকে শুরু হয়ে চলে আসছে তাদের এ চাষাবাদ। তখন টমেটো বাগানে অনেকগুলো নারী শ্রমিক কাজ করছিলেন। এদের বেশিরভাগ চা বাগান থেকে এসেছে। জমি থেকে তারা টমেটো তুলছিলেন। চা বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক মজুরিতে কাজ করে থাকেন। মৌসুমের সময় এখানে দুই থেকে তিন শতের মতো বাগান শ্রমিক কাজে যুক্ত হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ বাগান শ্রমিকদের এভাবে দল বেঁধে বস্তির মানুষের কাজে যুক্ত হওয়া সহজে মেনে নেয় না। তারা এখানে বস্তির মানুষদের টমেটো চাষের জন্য জমি ভাড়া না দেয়ার বিষয়টি এখন ভাবছে বলে ওখানকার চাষিদের কাছ থেকে জানা যায়। তাওহিদ এখানে দশ কেদার জমিতে টমেটোর চাষ করে ছয় লাখ টাকার মতো টমেটো বিক্রি করেছেন। চার লাখ টাকার মতো খরচ হলেও তিনি আরও দুই থেকে তিন লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করেন। তারা জমিতে ৭০ টাকা থেকে বিক্রি করা শুরু করে এখন পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকায় পাইকারি বিক্রি করছেন। এভাবে ত্রিশজনের মতো চাষি জমি ভাড়া নিয়ে টমেটোর চাষ করছেন। এদের বাড়ি আদমপুরের বনগাঁও, মধ্যভাগ, নৈনারপার প্রভৃতি এলাকায়। টমেটো চাষে ঢলে পড়া রোগের সমস্যা থাকলেও এখানে কোনো দিন তারা কৃষি বিভাগের কোনো লোক কোনোদিন চোখে দেখেননি, এমন ক্ষোভও তারা প্রকাশ করেন। এখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে আমরা আরও দুই তিন কিলোমিটার দূরে কাঁটাবিল এলাকায় ধলাই নদীর পাড় দিয়ে টমেটো ক্ষেতে এসে পৌঁছি। আঁকাবাঁকা ধলাই নদীর ওপারে আদমপুর- এপাড়ে মাধবপুর। এখানে বিরাট এলাকা জুড়ে নদীর কিনার ঘেঁষে টমেটোর চাষ শুরু হয়েছে। এখানকার জমি বাগানের নয়- জমির মালিকানা বস্তির। তাই এখানে জমি ভাড়া নিতে কেদার প্রতি বছরের জন্য দশ হাজার টাকা জমির মালিককে দিতে হয়েছে। প্রচণ্ড শীতের মাঝে দিনরাত থেকে টমেটো রক্ষা করতে হয়। ঝুপরির মতো ঘর তৈরি করে রাতেও এখানে থাকতে হয়। এখানে শতাধিক কেদার জমিতে টমেটোর চাষ হচ্ছে- চাষি রয়েছেন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনের মতো। এখানকার চাষি আব্দুর রাজ্জাক আট কেদার জমিতে টমেটো চাষ করে আট লাখ টাকার মতো টমেটো বিক্রি করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে পাঁচ লাখ টাকার মতো। তিনি আরও তিন লাখ টাকার টমেটো বিক্রির আশা করেন। এখানে এসে একই অভিযোগ, কোনো কৃষি কর্মকর্তা, প্রশাসনের কিংবা এ জাতীয় লোকের কোনো দেখা নেই। তবে মাছের বাজারের মতো ঔষধ কোম্পানির হরেক কিচিমের লোকজনরা আসে- যায়। এখান থেকে গাড়ি দিয়ে টমেটো নিতে আসে হবিগঞ্জ, সিলেট, ঢাকা প্রভৃতি এলাকার মহাজনরা। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, এ দুটি স্থান থেকেই এ পর্যন্ত কমপক্ষে দুই কোটি টাকার টমেটো বিক্রি হয়ে গেছে। আরও কোটি টাকার টমেটো বিক্রি হতে পারে। সমগ্র কমলগঞ্জ থেকে কোটি কোটি টাকার টমেটো বিক্রি হয়ে থাকে- শুধু কি তাই, এখান থেকে লক্ষ লক্ষ টমেটোর গ্রাফটিং এর চারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়- যার অনেক খবরই অজানা। রাষ্ট্র কেবল জানে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হিসাব। দেশের বিশাল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে পড়ে থেকে যে অবদান রেখে চলেছেন, তাতে রাষ্ট্র ঢোল বাজিয়ে কৃতিত্ব নিলেও যাদের ঢোল বাজা উচিত তাদের ঢোল বাজে না। এ এক অদ্ভূত বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। এখানেও বাস্তব সত্যের চেয়ে অদ্ভূত। সাধারণ মানুষের এখন ভরসার জায়গা নেই। জীবন বাঁচাতে অনেকটা বাজি ধরে তারা পাহাড়ে, পর্বতে, সাগরে, নদীর কিনারে, সমতল, অসমতলে যেখানে সুযোগ পাচ্ছে শ্রম ঢেলে দিয়ে উপায় খোঁজে নিচ্ছে। ডানে বাঁয়ে সহায়ক শক্তি যেন কেউ নেই। মানুষ দীর্ঘকাল রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি দেখতে দেখতে এখন যেন তার জন্য ঝামেলার মতো হয়ে উঠছে। মানুষ নিজ ঘরে নিখোঁজ থেকে আত্মগোপনের মতো থেকে একটা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিয়ে কোথায় কীভাবে আছে তার জানান দিতেও তাগিদ বোধ করছে না। ‘মানুষ মানুষের জন্য’- এ বাস্তবতা নয়, এমন বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কগ্রস্ত থাকছে। এ অদ্ভূত বাস্তবতাকে বহন করেও শ্রমজীবী মানুষেরা গেরিলার মতো বেঁচে থাকার উপায় বা জীবন সংগ্রাম বহন করে চলছে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..