কমরেড তারা লাল সালাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

জিন্নাতুল ইসলাম : কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা ছিলেন একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও প্রখ্যাত শ্রমিকনেতা। বগুড়ায়, ‘তারা সেক্রেটারি’ নামে তিনি সর্বমহলে পরিচিতি ছিলেন। বেটে ধরনের ফর্সা সুন্দর একজন মানুষ। সবসময় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে পরতেন পালিশ করা জুতা। পান, সিগারেট খেতেন না। ৭৫ বছর বয়সেও অদম্য পরিশ্রমী একজন শ্রমিকনেতা ছিলেন। বয়স তাকে পরাস্ত করতে পারেনি বরং তিনি বার্ধক্যকে পরাস্ত করেছিলেন। মৃত্যুর মাত্র আধা ঘণ্টা আগেও বগুড়া মুদ্রণ শিল্প শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক শ্রমিকনেতা আফজলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় মোবাইলে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। কথায় ছিল না কোনো অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা, ক্লান্তি, উত্তেজনা। কে জানত যে মানুষটি মোবাইলে কথা বলার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে না ফেরার দেশে চলে যাবেন। মৃত্যু কখন, কী অবস্থায় কার জীবনে আসবে সত্যি তা বলা মুশকিল। প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার সাত্তার জেলার ধুনট উপজেলার তেতুলিয়া সরকারপাড়া গ্রামে ১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ৩ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বাবা-মার প্রথম সন্তান। ১৯৬০ সালে তিনি ধুনট থেকে বগুড়া শহরে আসেন এবং বগুড়া কটন মিলে শ্রমিক হিসেবে যোগদান করেন। ইতোমধ্যে কমরেড মোখলেসুর রহমান, কমরেড সুবোধ লাহেড়ী, ডা. আব্দুল কাদের চৌধুরী, আব্দুল লতিফ, মোশারফ হোসেন মণ্ডল প্রমুখ শীর্ষ কমিউনিস্ট এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় এবং তাদের সান্নিধ্য লাভ করেন। যুক্ত হন শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে। নির্বাচিত হন বগুড়া কটন মিল স্পিনিং শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সিবিএ নির্বাচনে তার প্রিয় সংগঠন জয়লাভ করলে তিনি প্রধান সিবিএ নেতা নির্বাচিত হন। তিনি পর পর বহু বছর সিবিএ নেতা ছিলেন। তার নেতৃত্বে বগুড়া কটন মিলসহ বগুড়ার বিভিন্ন কলকারখানায় বড় বড় লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। সেইসব লড়াইয়ে শ্রমিকেরা জয়লাভ করেছে। বগুড়া কটন মিলের মালিক শ্রমিকদের দেনা-পাওনা পরিশোধ না করে মিল বন্ধ ঘোষণা করেছিল। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা শ্রমিকদের সংগঠিত করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। মালিকের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করেন। কোর্ট মালিককে টাকা পরিশোধের আদেশ দেন। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের পাওনার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২২ লক্ষ টাকা মালিক পরিশোধ করেছে। ৭৩ লক্ষ টাকা পরিশোধ করতে মালিকের এখনও গড়িমসি। পুনরায় মামলা। গত ৬ জানুয়ারি মালিকের সম্পদ কোর্ট নিলামে তোলেন। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও ইতিহাস, রাজনীতি, শ্রমনীতির ওপর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। শ্রমনীতি তার মুখস্থ ছিল। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। তার স্মরণশক্তি ছিল তীক্ষ্ম। তিনি কোনো ঘটনা ভুলতেন না। সন, তারিখ ধরে তিনি অনর্গল কথা বলতে বা বক্তৃতা করতে পারতেন। বক্তা হিসেবে তিনি প্রথম সারির ছিলেন। প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা ১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি ছিলেন উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন একজন কমিউনিস্ট নেতা। তিনি কখনো দেরিতে কোনো সভায় আসতেন না। কোনো কারণে যদি সভায় না আসতে পারতেন তবে তা জানিয়ে অনুমতি নিতেন। তিনি কমরেডদের কঠোর সমালোচনা করতেন। তবে পার্টি ফোরামের বাহিরে তিনি কখনো কারও সমালোচনা করতেন না। এ বয়সেই তিনি দলীয় মুখপত্র সপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকা বিক্রি করতেন। সাপ্তাহিক একাতার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কমরেড মোসলেম উদ্দিন বললেন, ‘তারা ভাই নিয়মিত একতা’র বিল পরিশোধ করতেন। মৃত্যুর ২/৩ দিন আগেই বিল পরিশোধ করেছেন। একতার ব্যাপারে সবসময়ই খুব আন্তরিক ও সিরিয়াস ছিলেন।’ বগুড়ার যে কোনো শ্রমিক-কর্মচারী সমস্যা-সংকটে পড়লে তারা ভাইয়ের কাছে ছুটে যেতেন। এমনকি অন্য শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারাও সমস্যায় পড়লে তারা ভাইয়ের কাছে ছুটে যেতেন। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা উদারভাবে তাদের সহযোগিতা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর ফলে শ্রমিক আন্দোলনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আর একজন আব্দুস সাত্তার তারার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে বছরের পর বছর। এ বয়সেও তিনি পার্টি এবং টিইউসি’র কাজে দিনের পর দিন ছুটে বেড়িয়েছেন। তিনি নির্ধারিত সাংগঠনিক সফরে যান নাই– এমন ঘটনা কখনো ঘটে নাই। তিনি সহজেই একজন মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠকও। সব সময় শৃঙ্খলা মেনে চলতেন। স্পষ্ট এবং সত্য কথা বলতে তিনি পিছপা হতেন না। অহেতুক বেশি কথা তিনি বলতেন না এবং পছন্দও করতেন না। ছাত্র-যুব নেতারা তার নাতির বয়সী তবুও তাদের তুমি না বলে আপনি করে বলতেন। কোনো শ্রমিক তার সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি অন্তত চা না খাইয়ে তাকে যেতে দিতেন না। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারাকে বাদ দিয়ে বগুড়ার শ্রমিক আন্দোলন ভাবার কোনো সুযোগ নেই। শ্রমিকনেতা হিসেবে আব্দুস সাত্তার তারা দল-মত নির্বিশেষে সকলের কাছে সুপরিচিত। তিনি যে মহল্লায় বাস করতেন সেখানকার সকল মানুষ তাকে সম্মান করে শ্রদ্ধা করে। এলাকায় সালিশ-বিচারে মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন যে, তারা সেক্রেটারি কি বলেন। কোনও বির্তক ছাড়াই তার সিদ্ধান্ত সকলেই মেনে নিতেন। মানুষ আপদ-বিপদে পড়লে তিনি পাশে দাঁড়াতেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। বুর্জোয়া দলের শ্রমিক নেতাদের মধ্যে অনেকের গাড়ি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স আরও কত কি আছে। প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা এত বড় মাপের নেতা হয়েও অস্বচ্ছল একজন মানুষ ছিলেন। কোনোভাবে তার দিন কেটে যেতো। প্রয়াত আব্দুস সাত্তার তারা বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বগুড়া জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, বগুড়া সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) বগুড়া জেলা কমিটির সভাপতি, বগুড়া কটন মিল সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, বিভিন্ন বেসিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা, উত্তর চেলোপাড়া মসজিদ কমিটির সভাপতি। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন- “পুঁজিবাদ নয়, সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদই মানবমুক্তির একমাত্র পথ। পুঁজিবাদ বড়লোকদের সমাজব্যবস্থা, শোষণ-মুনাফা ছাড়া সে আর কিছু বোঝে না। পুঁজিবাদে ১ ভাগ শাসকে শোষণ করে ৯৯ ভাগ মানুষকে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি বড়লোকদের স্বার্থ রক্ষা করে। এদের দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কখনও সম্ভব নয়। সম্ভব নয় গরিব-মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিদের উত্থান আজ সময়ের দাবি। মেহনতি মানুষকে শ্রেণি চেতনায় সংগঠিত করতে হবে। কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিদের নেতৃত্বে আর একটি বড় লড়াই করতে হবে। সমাজ বিপ্লবের লড়াই। বুর্জোয়াদের হটিয়ে বামপন্থিদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত করতে হবে, নির্মাণ করতে হবে– সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। পুঁজিবাদী সমাজের পরবর্তী সমাজটাই হবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ। ইতিহাসে আগের প্রত্যেকটি সমাজের যেভাবে জন্মের পর মৃত্যুও হয়েছে পুঁজিবাদী সমাজেরও ঠিক একইভাবে বিকাশের একটি পর্যায়ের পর মৃত্যু ঘটবে। আর পুঁজিবাদী সমাজকে ধ্বংস করেই জন্ম নেবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ”। প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারার ত্যাগ, কর্মোদ্যম আমাদের প্রেরণা এবং সাহস যোগাবে। তিনি আত্মগোপনে থেকেছন, জেল খেটেছেন, তবু আপস করেন নাই। আত্মসমর্পণ করেন নাই। আমৃত্যু লড়াই করেছেন গরিব মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি ১৯৭৩ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে জার্মানি সফর করেন। কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন ২৬ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৩০ মিনিটে। তবে এটাও ঠিক এক অর্থে, বিপ্লবীরা মরে না। তারা বেঁচে থাকে আদর্শে-লড়াই-সংগ্রামে। প্রয়াত নেতার রেখে যাওয়া হাতুড়ি-কাস্তে খচিত লাল পতাকা শক্ত হাতে ধরে আমরা বীরদর্পে সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। এই ঘুনে ধরা সমাজ ভাঙবোই–গড়বো নতুন সমাজ-নতুন সভ্যতা। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ। প্রিয় নেতা প্রয়াত কমরেড আব্দুস সাত্তার তারা লাল সালাম। লেখক : সভাপতি, বগুড়া জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..