সময় এখন প্রতিরোধের

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
হাবীব ইমন : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লোকরহস্যে বলেছিলেন, ‘পণ্ডিতেরা বলেন যে, কালক্রমে পশুদিগের অবয়বের উৎকর্ষ জন্মিতে থাকে; এক অবয়বে পশু ক্রমে অন্য উৎকৃষ্টতর পশুর আকার প্রাপ্ত হয়। আমাদিগের ভরসা আছে যে, মনুষ্য-পশুও কালপ্রভাবে লাঙ্গুলাদি বিশিষ্ট হইয়া ক্রমে বানর হইয়া উঠিবে।’ বঙ্কিমের এই কথাগুলো এতো তাড়াতাড়ি অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে, কয়েক দশক আগেও আমরা তা ভাবতে পারি নি। মহাভারতের এই অরণ্যপর্বে অধিকাংশ মনুষ্যপশু ঘাসাচারী ভূচর হলেও বৃক্ষচারীদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। রাজনীতির শাখায় শাখায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডালে ডালে তাদের সলম্ফ বিচরণ, সদম্ভ ভ্রুকুটি এখন নিত্য দৃষ্টব্য। বিবর্তনের অনিবার্য নিয়মে তাদের শুধু লেজ গজিয়েছে তাই নয়, লেজ মোটাও হয়েছে, তাদের কন্দর্পকান্তি রূপে রূপিয়ার জেল্লা লেগেছে। তারা এখন উঁচু ডালের আখের গোছানো সফল ব্যক্তি। ফলত একদিন যে ভূচারী চতুষ্পদের পিঠে পা রেখে তাদের ঊর্ধ্বারোহণ পর্ব শুরু হয়েছিল সেকথা আক্লেশে ভুলে যাবার সময় এসেছে। মাটির স্মৃতি, দেশের কথা কবেই বিস্মরণের তলদেশে চলে গেছে। আদর্শ এখন ব্যক্তিগত এবং দলের উদ্দেশ্যসিদ্ধির অছিলায় পরিণত হয়েছে। দেশ ডুবুক, গ্রাম-শহর রসাতলে যাক, চাটুকারদের সান্নিধ্যে মগের মুল্লুকে ভরে উঠুক, তাদের এখন কিছুই যায় আসে না। নরের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে তার এখন বানরে অর্পিত, নরমু- এখন তাদেরই হাতে। হাঁড়ির হাল বুঝতে একটি ভাতই যথেষ্ট। একটি দেশের হাল-চিত্র দেখার জন্য চারদিক হাতড়ে মরার দরকার নেই, একজোড়া গ্রাম কিংবা শহরই তার যথেষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা যে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে ঢাকার ভেতরে জনজীবনই তার সাক্ষ্য দেবে। এক সেতুতে বাঁধা এই শহরের জীবনযাত্রায় অনেকখানি ফারাক। দিনে ও রাতে যেমন পার্থক্য মিলে, তেমনই ঢাকার বিভিন্ন আনাচে-কানাচে মাড়ালে টের পাওয়া যায়, তফাৎ কতখানি। তখন দুয়োরাণী সুয়োরাণীর কাহিনি মনে পড়ে। একদিকে মহানগরী, অন্যদিকে শহরের। একসময় বুড়িগঙ্গার ওপার-এপারের দিকে তাকিয়ে হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হতো। কিন্তু আজ আর সেদিন নেই। আদরের পাটরাণীর মতো এককালের ত্রিলোত্তমা ঢাকার সেই রূপের ঐশ্বর্য আজ নেই। সবুজ পত্র-পল্লবে ভরপুর ছিল। এখন অন্তর্জরী যাত্রায় শেষ দশায়। এই ঢাকা আজ ‘যাচ্ছেতাই’য়ের ঢাকা। চারিদিকে আবর্জনার নরক, ধুলোধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, রাস্তাগুলো খানাখন্দে দুর্গম। মাঠ-ঘাট লোপাট, ফাঁকফোকর নিশ্চিহ্ন, কেবলই গাঁথুনির পর গাঁথুনি উঠছে। মওকা বুঝে মকান মাথা তুলছে, ধূর্ত ভিনদেশি কারবারীদের ঢালাও অনুপ্রবেশ ঘটছে। পাড়া-মহল্লায় সরকারি দলের নীরব মাস্তানি, কালোয়াতি, কালোবাজার জাল বিছিয়ে চলছে। পুলিশ বা রাষ্ট্রযন্ত্রের তাতে কোনো ভাবান্তর নেই। তারা কাগজ-কলমে ব্যস্ত। নিরুপায় জনমানুষের আবেদন-নিবেদন ক্ষোভ-বিক্ষোভ কর্তৃপক্ষের উঁচু কানে পৌঁছায় না। পারলে নিরীহ কোনো যুবকের পকেটে এরা ইয়াবা ধরিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃত অপরাধ দমনে প্রয়োজনও পড়ে না, রাতে ব্যালেট বাক্স, দিনে করের বোঝা চাপিয়ে দিতে তাদের কোনো অসুবিধা হচ্চে না। তামাম দেশ কীভাবে চলছে কেউ জানে না। কারা চালাচ্ছে জানে না তাও। যখন গেলো গেলো হুলস্থূল শুরু হয়, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ কিংবা প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। শুধু কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের ঢঙ্কা নিনাদ থেকে থেকে শোনা যায়। ফ্লাইওভার হচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে, আরো কতোকিছু। চোখ ধাঁধানো সব কাজ-কারবার। কিন্তু আসল কাজগুলো কী হচ্ছে! এই যে রাতের বেলায় অসংখ্য মানুষ ফুটপাতে তর তর করে কেঁপে কেঁপে রাত কাটাচ্ছে, কে দেখছে তাদের। এখানে কী দারিদ্র্যতা আর বৈষম্য বোঝায় না? দেশের কাজ দশের কাজ এখন শুধু কথার কথা। আর আদর্শ কথা ফাঁকা আওয়াজ। মুদ্রার মাদকে প্রতিটি অফিস আচ্ছন্ন, কোথাও কাজ হয় না। সমাজবিরোধী ছাত্র-যুবকদের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দিচ্ছে মানুষখেকো রাজনীতি। তবু দেশ চলছে, থেমে নেই। অচল টাকার মতো হাত বদল হতে হতে আরও কিছুদিন চলবে। তারপর সেই চরম মুহূর্ত আসবে। যখন তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হবে, হৃৎপি- চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে যাবে। তার হয়তো খুব বিলম্ব নেই। দুর্বলে সবলা নাড়ির মতো, দেশের মুমূর্ষু দেহে রাজনীতির দরদবাণী তারই পূর্বাভাস। কিন্তু তার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। প্রতীক্ষারত অসংখ্য স্বপ্ন ও অগণিত প্রত্যাশা এবার বাস্তবায়িত ও সার্থক করার দায়-দায়িত্ব আমাদের সামনে। আমৃত্যু বিপ্লবী কমরেড জসীম উদ্দিন মণ্ডলের মতো বলতে হয়, ‘এই পঁচাগলা-ঘুনে ধরা সমাজটাকে ভাঙতে হবে’। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে যে-প্রতিশ্রুতির বন্যায় দেশের যুবক সমাজ ভেসে গিয়েছে, সেই বন্যার জল এখন সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ী ক্ষমতাসীনদের পকেটে চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের যে অভিন্ন চারটি মূলনীতি, সেগুলোকে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে জলাঞ্জলি দিয়েছে। গলায় মুক্তোর মালা পরে উর্ধ্বলোক থেকে তারা শেষ খেলা খেলে যাচ্ছে। শিক্ষাকে গোরস্থান বানিয়ে, শাসনযন্ত্রকে শোষণযন্ত্রে পরিণত করে, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মোটা দাগে ক্রয় করে ইত্যাদি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে তাদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কেননা সবই দেখছি, দেখে যাচ্ছি। শুধু বঙ্কিমের অনুকরণে বলতে ইচ্ছে করে, ‘হে লায়েক ভ্রাতাগণ, অত কামড়াকামড়ি করিয়া খাইও না, তাড়াতাড়ি ফুরাইয়া যাইবে। চাটিয়া চাটিয়া খাও, তাহা হইলে এই দেশ অনেকদিন ভোগ করিতে পারিবে।’ বিগত দশকের শেষের দিকে এসে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সমতা, বৈষম্যমুক্তকরণ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্ষেত্রে যে অল্পবিস্তর অগ্রগতি হয়েছিল, সেগুলো গত দুই দশকে পিছু হটেছে। এই সময়ে মুখ্য বৈশিষ্ট্য হলো, পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হওয়া। পুলিশ দিয়ে প্রতিপক্ষের শক্তিকে দমন-নিপীড়ন চলছে। গত ৩০ ডিসেম্বর বাম গণতান্ত্রিক জোটের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ অন্তত ৪৫ জনকে আহত করেছে। কোনো ধরনের স্বাধীনতা সরকার আর মেনে নিচ্ছে না। যারা আইনের শাসন, ব্যক্তি স্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও উন্নত জীবন সন্ধান করে ফিরছেন, তাদের জন্য এতোটা বড় দুঃসময় আর কখনো আসেনি। সংসদীয় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার ধারণা নিষ্প্রভ হতে চলেছে। রেমিট্যান্স বাদে অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকগুলো নিম্নমুখী। বছরের শেষে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে ৩০০ টাকা ছাড়িয়েছে। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধি জনজীবনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কয়েক দফা গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এখন বছরে একাধিকবার দাম বাড়াতে সরকার আইন (বিইআরসি) সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা ‘জ্বালানির দাম বছরে একাধিকবার পরিবর্তন করা যাবে’ গণবিরোধী এমন বিধান রেখে সংশাধন আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাৎ সরকার আবারও তাদের লোকসানের ব্যর্থতার দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। যুবকদের সরকারি চাকরি পদায়ন, পদোন্নতি, নিয়োগদানের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়াকরণ, ঘুষ বাণিজ্য ইত্যাদি চলেছে। সামাজিকভাবে অস্থিরতাসহ নানান অসঙ্গতিতে যুবকরা মনে করে, দুঃশাসন আর বুর্জোয়া সরকার আর না। আওয়ামী লীগের বদলে বিএনপি সরকার, তাও দেশের মানুষ চায় না। এই প্রেক্ষিত কিংবা বাস্তবতার নিরিখেই ক্ষমতাগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা বামপন্থি তরুণদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশে যুবকদের হাতে নেতৃত্ব এসেছে। আমাদের দেশে যুবকদের মনে সৃষ্টি হওয়া এই আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সাধুবাদ জানাতে হয়, কিন্তু সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে যে-দৃঢ়তা, ৪৮ বছরের রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারমুখিনতা, গতানুগতিকতা বর্জনের মানসিকতা ও সাহসিকতা একান্ত প্রয়োজন, তার অর্জন ঐক্যতার সঙ্গে স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের ভেতর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যুগান্তর ও দৃশ্যান্তর ঘটিয়ে চমক দেখানোর অদৃশ্য জাদুদণ্ডটি আদতে যুব সমাজের কাছেই। এই সত্যটি রাজনীতিকরা ভুলে যান। আশা করা যায়, আমাদের বামপন্থিরা এটা ভুল করবেন না। নিশ্চয় তাদের ওপর এখনও যুব সমাজের ভরসা আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘নববর্ষে’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘নিশি অবসানপ্রায়, ওই পুরাতন/বর্ষ হয় গত!/আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও, যে কে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো,/পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ এই কবিতা বিশ্বকবি লিখেছিলেন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে। কিন্তু ২০১৯ অবসানে ২০২০ এর শুরুতে এই কবিতা উচ্চারণ ক্ষতি নয়। বরং এটাই বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজনীতিতে এখন যে অমাবস্যার কাল, তাতে সুশাসন-গণতন্ত্র-মানবিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সময় এখন অপশাসন প্রতিরোধের। মার খাওয়ার দিন শেষ করতে হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগর

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..