মধ্যপ্রাচ্য: বিস্ফোরকের বাক্সে ডিনামাইট ছুড়ে দিয়েছেন ট্রাম্প

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মীর মোশাররফ হোসেন : ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের একটা কৃতিত্ব পেন্টাগন পেতেই পারে। এমন নয় যে, হুট করে, অনেকটা ঝোঁকের মাথায় তারা এটি করে বসেছে। খোঁজ পেয়েছে, আর সঙ্গে সঙ্গে কাসেম সোলেমানিকে শেষ করে দিয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা দফতরের তথ্যই বলছে, তারা এর আগে অন্তত দুই দফা সোলেমানিকে রেঞ্জে পেয়েও ছেড়ে দিয়েছিল। ইরানকে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের খেলা এবং মুখোমুখি যুদ্ধে না নামাতেই তা করেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প কি করেছেন? জেনে বুঝে পরিকল্পিত উপায়েই কুদস বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছেন। এবং ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের দাবা খেলায় ছুড়ে দিয়েছেন ওপেন চ্যালেঞ্জ। খেলার ফলাফল কি হবে, তা নিয়ে অনুমান করতে গিয়ে বৃথা সময় নষ্ট না করে আমরা বরং দেখি- এ খেলায় আর কারা কারা আছেন। মধ্যপ্রাচ্য এমন এক ‘লড়াই ক্ষেত্র’, যার আগুন জ্বলছে শতকের পর শতক ধরে। সবারই লক্ষ্য এর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। ভৌগোলিকভাবে এর গুরুত্ব তো ছিলই সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানিসম্ভার। সুতরাং, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর তার ইউরোপীয় দোসরদের ঈগল চোখ তো থাকছেই। ২০১৫ সালের পর থেকে সিরিয়ার আমন্ত্রণে সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে রাশিয়াও। ব্যবসা এবং ভূকৌশলগত কারণে, আওয়াজে না থাকলেও, আপনি চীনকে বাদ দিতে পারছেন না। অর্থাৎ, এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং সবচেয়ে বেশি অস্ত্র উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ সবাই মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিত। আঞ্চলিক পক্ষগুলোর দিকে খানিক চোখ বোলানো যাক। ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান; খানিকটা দূরে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের যাবতীয় ঘটনায় ‘স্টেক’ থাকবে তুরস্ক এবং মিশরেরও। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ভূরাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানান কাঁটাছেড়া হয়েছে, হচ্ছে। আঞ্চলিক, গোষ্ঠীগত, ধর্মীয়, জাতীয় স্বার্থ এমন বিবেচনায় পক্ষেরও অদল-বদল হয়েছে। চলেছে রক্তের হোলিখেলা। গোষ্ঠীগত এবং ধর্মীয় ভেদাভেদের ক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নি বিভক্তিও এখানকার রাজনীতির অন্যতম প্রভাবক। কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক, রাজনৈতিক দখলদারিত্ব নিশ্চিত করতে এবং তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে মধ্যপ্রাচ্যে অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি বসিয়েছে। নিজেদের পছন্দের শাসককূলকে বসাতে একের পর এক ‘রেজিম চেঞ্জ’ করেছে। কখনো অস্ত্র-অর্থ দিয়ে, ভেদাভেদ উস্কে দিয়ে, কখনো কখনো তো একেবারে সরাসরিই- আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, দখলে নেমে। গত কয়েক বছর বিশেষ করে সিরিয়ার যুদ্ধ এ পক্ষগুলোর আন্তঃসম্পর্ককে অনেকখানি স্পষ্ট করেছে। কে কার মিত্র, কেন মিত্র, কোথায় কার খুঁটি বাঁধা- তা উন্মোচন করেছে। খোলা চোখে দেখলে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনের একচেটিয়া আধিপত্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বাধা হয়ে আছে মূলত ইরান। এমনিতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দুই মোড়ল তার নিয়ন্ত্রণে- সৌদি আরব ও ইসরায়েল। নিজেরা মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে হুংকার ছাড়লেও রিয়াদ এবং তেল আবিবের মধ্যে যে অনেক বিষয়ে তথ্য আদান প্রদান ও যোগাযোগ চলছে, তা সিরিয়া যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে প্রায় সবার কাছেই পরিষ্কার। সিরিয়ার আসাদ, ইরান, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতিরা- দুই দেশেরই ‘কমন’ শত্রু। এমনকি জেরুজালেম নিয়ে ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনেও গত কয়েক বছর ধরে রিয়াদের নাখোশ অবস্থান সবাই দেখেছে। উপসাগরে যুদ্ধ, ইরাক-লিবিয়ায় আগ্রাসন, আরব বসন্ত, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান এ সবকিছুই মধ্যপ্রাচ্যকে কেটেছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে, বানিয়ে রেখেছে জ¦লন্ত উনুন। ইরাকে সাদ্দামকে উৎখাত করার পর থেকে আরব বসন্ত, আইএসের বিস্তার সবকিছুই ওয়াশিংটনের ছক কেটে হচ্ছিল। রেজিম চেঞ্জ করে বসানো যাচ্ছিল পুতুল সরকার; ওদিকে তুরস্ক ন্যাটো সদস্য; মিশরে ব্রাদারহুড পরবর্তী সৌদিঘনিষ্ঠ সরকার। সবকিছু মিলেই বৃহস্পতি তুঙ্গে। আইএস আর তুর্কি বিদ্রোহীদের যৌথ টার্গেটে জেরবার হচ্ছিল সিরিয়া। বাশার আল আসাদকে সরাতে পারলে একদিক থেকে ইসরায়েলের পোয়াবারো; অন্যদিকে তুরস্ক পারে কুর্দি ওয়াইপিজে গেরিলাদের কচুকাটা করে দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে। সিরিয়া দুর্বল হলে লেবাননের হিজবুল্লাহদের এক মটকায় সরিয়ে এরপর সরাসরি তাক করতে পারে তেহরানের দিকে। দাবার এ দান ঘুরতে শুরু করে ২০১৫ সালের শেষ দিক থেকে। বাশার ডেকে বসেন মস্কোকে। পুতিন সুযোগ হাতছাড়া করেননি। আইএস দমন এবং বাশারকে ক্ষমতায় পুনস্থাপিত করতে আসে রুশ সেনা, বোমারু বিমান। অবশ্য তার আগ থেকেই ইরান আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে গেছে, লেবাননের হিজবুল্লাহদের সঙ্গে নিয়ে। এ তিন ‘ট্রায়োর’ মৈত্রী বদলে দেয় পেন্টাগনের পরিকল্পনা। কেবল বদলে দেয় বললে বোধহয় ভুল হবে। চারবছর পর এসে বলতে হচ্ছে, একেবারে কেঁচে দিয়েছে। সিরিয়ায় বাশারের নিয়ন্ত্রণ ফিরেছে; আইএস পাততাড়ি গুটিয়েছে, লেবাননে হিজবুল্লাহরা রাজনৈতিক-সামরিক সব অক্ষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে, ইয়েমেনে ফুলে ফেঁপে ওঠা হুতিরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাত-যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের সামরিক সক্ষমতাকে। গত দেড় দশক যে দুর্গ থেকে নানান চাল চেলেছে মার্কিনিরা, সেই ইরাকে শিয়ারা প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। কেবল তাই নয়, এতদিন শত্রু অক্ষে থাকা তুরস্ক-কাতারও পাল্টে গেছে। কেউ কেউ এমনকি আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গেও এখন তেহরান-মস্কো-দামেস্কের গোপন যোগাযোগ দেখছেন। দুটো সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বাড়িয়েছে। এক, অনেক বছরের নিষেধাজ্ঞার পর ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি। এতে পশ্চিমা দেশগুলো ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুমুল ব্যবসা বাণিজ্য তার অর্থনীতিকে গতি দিয়েছিল; আর দুই, সাদ্দামের পতনের পর মার্কিন সেনাদের ইরাকে উপস্থিতি। তেহরান ছিল তক্কে তক্কে, তার লক্ষ্য ছিল ইরাক, লেবানন, জর্ডান, কাতার, বাহরাইন, কুয়েতের শিয়া সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা; আর অঞ্চলজুড়ে মার্কিন-সৌদি-ইসরায়েল বিরোধী রাজনৈতিক ও সশস্ত্র শক্তিকে অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কৌশল সরবরাহ। সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে কেন্দ্র করে তেহরান যখন আদাজল খেয়ে নামল, তখনই তার এসব ‘গোপন কৌশল’ অন্যদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভুল না করলে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মধ্যেই ইসরায়েলের অসংখ্য সতর্কবার্তায় তেল আবিবের দুঃশ্চিন্তার বিষয়টি বারবার ধরা যাচ্ছিল। ট্রাম্প এসে নেতানিয়াহুকে উদ্ধার করলেন। প্রথমে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে সরলেন; এরপর আগের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলেন। সেখানেই ক্ষান্ত দেননি, তেহরান যেন কারো কাছে তেল বেচতে না পারে, তার সঙ্গে কেউই যেন ব্যবসায় না জড়ায়, সেজন্য নতুন নতুন ব্যবস্থাও নেন। মধ্যপ্রাচ্যে নানান উসিলায় বাড়াতে থাকেন সেনা উপস্থিতি। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন মিত্র দেশগুলোর কাছে বিক্রি শুরু করলেন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-সরঞ্জাম। গত বছর ওয়াশিংটন আর তেহরানের উত্তেজনার পারদ সমানে চড়তে শুরু করে। হরমুজে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত, পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দ, তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা, রেভ্যুলেশনারি গার্ড বাহিনী ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন বাহিনীকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা, লেবানন-ইরাক-সিরিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তন পট প্রস্তুত করেই রেখেছিল। নববর্ষের ক্ষণ পেরুতে না পেরুতেই ট্রাম্প সেই ‘বিস্ফোরকের বাক্সে’ ডিনামাইট ছুড়ে দিয়েছেন, কাসেম সোলেমানিকে হত্যা করে। কুদস বাহিনী হচ্ছে ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের বিদেশি উইং- একই সঙ্গে গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থা। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, জর্ডান, ফিলিস্তিনে এরা দৃশ্যত সক্রিয়; মধ্যপ্রাচ্য-আরব বিশে^র অন্যত্রও ক্রিয়াশীল। এটি রেভ্যুলেশনারি গার্ডের বিদেশি শাখা হলেও, এর কমান্ডার সরাসরি আয়াতুল্লাহ খামেনিকে জবাবদিহি করেন। খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা; সোলেমানিকে বলা হতো দ্বিতীয় ক্ষমতাধর। ১৯৯৮ সালে কুদস বাহিনীর দায়িত্বে এসেছিলেন; পরের দুই দশক তার পরিকল্পনা এমন কার্যকর হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে, যে সোলেমানি ইরানে কিংবদন্তি হিসেবে খ্যাত হচ্ছিলেন। পরিণত হয়েছিলেন ইরানের ‘গর্বে’। ট্রাম্প সেই গর্বকেই ধুলিস্মাৎ করার কার্ড খেলেছেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। চূড়ান্ত ডুয়েলে আহ্বান। কিন্তু গেরিলা কায়দায়, বন্ধুদের সহায়তা নিয়ে, ‘অ্যাসিমেট্রিক পদ্ধতিতে’ যুদ্ধ করা আর মুখোমুখি লড়াই ভিন্ন জিনিস। সুতরাং ইরান যে সোলেমানি হত্যার বদলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক হামলা চালিয়ে সম্মান পুনরুদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়বে না, তা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। ট্রাম্পের ড্রোন হামলার পর থেকেই পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো উসকানিমূলক নানান প্রতিবেদন ছেপে যাচ্ছে। বলছে, ইরান প্রতিশোধ নেবে এবং তাতে বাধবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই মুহূর্তে এ ধরনের কিছু ঘটা একেবারেই অবাস্তব। ঘটলে লাভ মার্কিনিদেরই। অন্যদিকে ইরান চাইলেও বিবদমান তার মিত্র হিসেবে পরিচিত সব পক্ষকে নিয়ে ‘অল আউট’ যুদ্ধে যেতে পারবে না, সুতরাং তার লক্ষ্য থাকবে আগের কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। ‘পপুলার রেজিস্ট্যান্স ফোর্স’গুলোকে শক্তিশালী করা, সৌদি আরব ও ইসরায়েলকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং যত দ্রুত সম্ভব মার্কিন বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া করা। সোলেমানি হত্যার পাল্টায় তাদের জন্য বেশকিছু সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। ইরাকে শিয়াদের একজোট করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে, রাজনৈতিক এমনকি সামরিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসামন্ত সরানোর চাপ বাড়ানো যাবে। মিত্রদের আন্তঃসম্পর্কও জোরদার হবে। ইতিমধ্যে ওয়াশিংটন, তেল আবিব এবং রিয়াদের সুর একটু নরম দেখা যাচ্ছে। চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার। যা-ই ঘটুক না কেন; মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের লাগাম আলগা হওয়ার সম্ভাবনাই বাড়ছে। লেখক : সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..