রাষ্ট্রযন্ত্র

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেশের আইন-কানুন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, আমলা-অফিসার-কেরানিকুল-পুলিশ-মিলিটারি প্রভৃতিকে নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র গঠিত। এগুলো হলো একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে বিরাজমান রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্র। একটি দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র সে দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি-দর্শন দ্বারা নির্ধারিত হয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে যেকোনো নির্র্দিষ্ট সময়ে কোনো এক বা একাধিক শ্রেণির হাতে আধিপত্য থাকে। অপরাপর শ্রেণি তখন থাকে তার অধীনে, থাকে পদানত। অর্থনৈতিক শক্তিতে যে শ্রেণিটি যখন নিয়ন্ত্রকের আসনে অধিষ্ঠিত থাকে, তখন তার হাতেই থাকে আধিপত্য। রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র ও ধারা গড়ে ওঠে সেই আধিপত্যে থাকা স্বার্থকে সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র ও ধারা অপরিবর্তিতভাবে চালু থাকার অর্থ হয়ে দাঁড়ায়–আধিপত্যকারী শ্রেণির আধিপত্যের অব্যাহত প্রলম্বন। গত চার দশকে দেশে এসেছে নির্বাচিত সরকার, সামরিক সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিএনপি সরকার, আওয়ামী লীগ সরকার, বিএনপি-জামাত সরকার, চার দলীয় জোট সরকার, মহাজোট সরকার ইত্যাদি নানা ধরন ও নেতৃত্বের সরকার। এদের মধ্যে ক্ষমতার হাত বদল হয়েছে। কিন্তু তাদের কারো দ্বারাই কখনও রাষ্ট্রযন্ত্রের ও তার চরিত্রের বদল ঘটানো হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পরে-পরে যে বিপ্লবী পরিবেশের উদ্ভব ঘটেছিল, একমাত্র সে সময়টাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রগতিশীল রূপান্তরের একটি বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু শাসক দল আওয়ামী লীগের শ্রেণি-চরিত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনার পথ ধরে অগ্রসর হওয়া হয়ে ওঠেনি। অবশেষে পঁচাত্তরের পর তো আনুষ্ঠানিক উল্টোযাত্রা শুরু! গত সাড়ে চার দশক ধরে দেশ সে উল্টোপথ ধরেই চলছে। এখন রাষ্ট্র ছোট হয়ে আসছে। সবকিছুর তো ব্যক্তিগতকরণ ঘটছে। ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি আর আগের মতো থাকছে না। একথা ঠিক যে সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দুনিয়ায় বর্তমানে যে নয়া-উদারবাদী দর্শন অবলম্বন করে অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে তার একটি অন্যতম নীতি হলো রাষ্ট্রকে ছোট করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, সামাজিক কাজকর্মে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনা। কিন্তু সামাজিক কল্যাণে ও অর্থনৈতিক বিনির্মাণে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা হলেও কোনো দেশেই রাষ্ট্রকে ছোট করা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের মোট অবয়ব ও তার পেছনে যে মোট রাষ্ট্রীয় খরচ, তা কমার বদলে ক্রমাগত বাড়ছে। উন্নত দেশ হোক কিংবা তা আমাদের মতো প্রান্তঃস্থিত অনুন্নত কোনো দেশ হোক, পুঁজিবাদী বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্র ছোট হওয়ার বদলে আসলে বড় হচ্ছে। বর্তমান সরকার পূর্বেকার সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় সামরিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বড় আকারের নতুন অস্ত্র-শস্ত্রের মার্কেটিং করে চলেছে। এই সরকার যে সামরিক বাহিনী বান্ধব নীতি অনুসরণ করছে তা প্রমাণে সে বিশেষভাবে যত্নবান। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিবেচনাও কার্যকর। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত রাষ্ট্রযন্ত্রের কলকব্জাগুলোকে সরকার প্রসারিত ও উন্নত করেই চলেছে। খরচও ক্রমাগত বাড়ছে। নিত্যনতুন বাহিনী সেখানে যুক্ত করা হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীতে রবোকপ-এর সাজে সজ্জিত নতুন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। শ্রমিকদের ‘ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা’ রাখার জন্য ‘শিল্প পুলিশ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয়ভাবে ব্যবহার না করে এরকম একটি জনসমর্থনহীন সরকারের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে সুকৌশলে দলীয়ভাবে কাজে লাগিয়ে ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারকে একতরফা নির্বাচনের প্রহসন করতে হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সেই পন্থার ওপরেও ভরসা রাখতে পারেনি। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন তাকে ‘২৯ তারিখ রাতেই’ সেরে ফেলতে হয়েছিল। এই কাজে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপরেও সে নির্ভর করার সাহস পায়নি। ভুয়া বিজয়ের প্রহসন মঞ্চায়িত করার জন্য তাকে এবার রাষ্ট্রযন্ত্রের পুলিশ, গোয়েন্দা, প্রশাসনের ওপর প্রায় সর্বাংশে নির্ভর করতে হয়েছে। এভাবে ক্ষমতায় কে থাকবে তার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রকের আসনটি রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে সরকার নিজেই তুলে দিয়ে তাকে দেশের প্রকৃত কর্তা বানিয়ে দিয়েছে। দেশের ৯৯% মানুষের জীবন যন্ত্রণা বাড়ছে। মানুষের মনে বাড়ছে চেপে রাখা ক্ষোভ ও অস্থিরতা। অন্যদিকে অবশিষ্ট ১% লুটেরা ধনিক গোষ্ঠীর মধ্যে লুটপাটের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে রাজনীতিতে সংঘাত-নৈরাজ্য বাড়ছে। উভয়বিধ কারণে বাড়ছে সামাজিক নৈরাজ্য। এসব অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য রাষ্ট্রকে তার নিপীড়নের যন্ত্র আরো শক্তিশালী করে, আরো বেশি নিবর্তন-নিপীড়নমূলক হয়ে উঠতে হচ্ছে। এটা করতে হতো না যদি রাষ্ট্র জনকল্যাণে খরচ না কমাতো এবং অর্থনীতিতে অবাধ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার নীতি অনুসরণ না করতো।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..