মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইলের সমালোচনায় চিঠি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনির তালুকদার : বছরের পর বছর ধরে ইসরাইল ফিলিস্তিনের বৈধ অধিবাসীদের সরিয়ে দিয়ে তাদের অবৈধ কলোনি নির্মাণ করেই যাচ্ছে। আর ইসরাইলকে অব্যাহতভাবে অবিরাম সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকারগুলো। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প অন্যাদের চেয়ে খোলামেলা বেশি ভূমিকা পালন করছেন। অন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যেখানে রয়ে-সয়ে বা একটু কথার মারপ্যাচে রেখে ইসরাইলকে সমর্থন করেছে, সেখানে ট্রাম্পের বুক আর ইসরাইলের প্রতি নিজের সমর্থন ব্যক্ত করছেন। তবে উদ্বিগ্নের কারণ হলো– প্রতিবেশি মুসলিম নামধারী আরব দেশ কিংবা মানবাধিকারের প্রবক্তা ইউরোপিয়ান নেতাদের পক্ষ থেকে এর তেমন কোনো প্রতিবাদ আসেনি। বরং বছরের পর বছর ধরে তাদের পক্ষ থেকে নিরুত্তাপ যেসব বিবৃতি এসেছে তাতে ইসরাইলকেই সমর্থন করা হয়েছে– আর তা এতটাই সেকেলে যে, ইসরাইল ও মার্কিন নেতারা তা আগে থেকেই বুঝতে পারতেন এবং যথারীতি উপেক্ষা করতেন। বরং এ ক্ষেত্রে চমক হিসেবে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যদের পক্ষ থেকে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে লেখা একটি চিঠি। মিশিগানের আনকোরা কংগ্রেস সদস্য অ্যান্ডি লেভিনের পাঠানো ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন আরো ১০৬ জন কংগ্রেস সদস্য। এটা ঠিক, লেভিনের চিঠিটি কোনো আইন নয় বা তার এই চিঠিতে মার্কিন নীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না, তার পরও ওই চিঠিটি আলোচনায় আসার বেশি কিছু কারণ রয়েছে। ওই চিঠিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– এতে ফিলিস্তিন ভূমিতে ইসরাইলের দখলদারিত্বের ব্যাপারে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন প্রয়োগের ব্যাপারটিতে ব্যাপক জোর দেয়া হয়েছে। মাইক পম্পেওকে পাঠানো ওই চিঠির তৃতীয় ও শেষ প্যারায় বলা হয়েছে– মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৪৯ নম্বর ধারাকে লঙ্ঘন করেছে। ওই ধারায় নিশ্চিত করা হয়েছে, “কোনো দখলদার গোষ্ঠী তার দখলকৃত জায়গার বেসামরিক লোকজনকে ওই অঞ্চল থেকে স্থানান্তর করতে বা নির্বাসন দিতে পারবে না। ” এ ক্ষেত্রে যদি যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে আন্তর্জাকি আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে থাকে, তাহলে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্যে আরো বেশি বিশৃঙ্খল এবং নির্মম একবিংশ শতাব্দীর শঙ্কাই আমরা অবশ্যই করতে পারি। মূলত এই প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসের যথেষ্ট সংখ্যক সদস্য ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের প্রায়োগিকতার বিষয়টি তুলে এনেছেনে। এর আগে ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে এসব কনভেনশন লঙ্ঘনে ইসরাইলকে জবাবদিহি করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে রেজ্যুলেশন পাস করে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র যেসব কারণে ওই কনভেনশনকে মেনে নিতে অস্বীকার করে, তার মূল কারণ হলো– ইসরাইল ১৯৬৭ সালে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে নেয়ার বিষয়টিকে “দখল” বলে মানতেই রাজি নয়। তাদের দাবি, এটা ফিলিস্তিনি ভূমি নয় বরং এটি একটি বিতর্কিত ভূমি। এর সূত্র ধরেই ইসরাইল দীর্ঘ দিন ধরে এ কনভেনশন ফিলিস্তিনি ওই ভূমিগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে রাজি নয়। কারণ এটি যদি প্রয়োগ করা হয়, তা হলো ইসরাইল যেসব অপরাধে অপরাধী হবে, তার খতিয়ান বেশি দীর্ঘ। তাদের অপরাধের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল, ফিলিস্তিনিদের সম্পদ– বাড়ি-ঘর ধ্বংস করা, ওইসব স্থানে নিজেদের নাগরিকদের জন্যে কলোনি তৈরি করা, ওইসব ভূমির খনিজ সম্পদ লুট করা, ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজেদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা ইত্যাদি। আর এর সাথে যুক্ত হবে ফিলিস্তিন নাগরিকদের অত্যাচার করা, শাস্তি দেয়া এবং অবৈধভাবে আটকে রাখার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন করার মতো গর্হিত অপরাধগুলোও। ইসরাইল মূলত তাদের মার্কিন লবিস্টদের দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে শুধু তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান বা পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা চালায় না, বরং তারা এদিকেও নজর রাখে যে, ফিলিস্তিনি যেকোনো আলোচনায় যেন, “দখলদার” বা “দখলদারিত্ব” শব্দ না থাকে। ২০১৬ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বার্নি স্যান্ডার্সের একটি কমিটির খসড়ায় “কলোনি” ও দখলদারিত্ব শব্দ দু’টি যুক্ত করার জন্যে বেশ চেষ্টা চালানো হয। কিন্তু ইসরাইলি লবির কারণে তাদের সে প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। “আমেরিকান-ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি” (আইপ্যাক) হলো যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিয়াশীল অন্যতম প্রধান ইসরাইলি লবি। গত মার্কিন নির্বাচনের আগে উইকিলিকসের ফাঁস করা ই-মেইলে দেখা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে আইপ্যাক বার্নি স্যান্ডার্সের সরাসরি বিরোধিতা করেছিল। কারণ তিনি ইহুদি ধর্মাবলম্বী হলেও ইসরাইলি নীতির বিরোধিতা করেছেন। ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। সাধারণ ডেমোক্র্যাট সদস্য ও সমর্থকদের মধ্যে স্যান্ডর্সের ব্যাপক সমর্থন থাকলেও তাকে দলের নীতি-নির্ধারকরা প্রার্থিতার দৌড় থেকে সরিয়ে দেয়। রিপাবলিক ও ডেমোক্র্যাট দুই দলের নীতি-নির্ধারণী মহলই আইপ্যাকের প্রতি আস্থাশীল। কারণ যেখানে জড়িত বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন। কেউ আইপ্যাক বা ইসরাইলের বিরোধিতা করলেই তাকে “ইহুদিবিদ্বেষী” বলে প্রচারণা চালিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে “একঘরে” করে দেয়া হয়। যেখানে থাকে ইসরামোফোবিয়া, বর্ণবাদ ও একচেটিয়া কর্পোরেট পুঁজির ব্যবহার। আইপ্যাকের শুরু ১৯৫০-এর দশকে কানাডীয় জায়নবাদী সাংবাদিক ও আইনজীবী ইশাইয়া এল “শি” কেনেনের হাত ধরে। কার্যত তখন তিনিই ছিলেন আইপ্যাক। ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে কেনেন বিভিন্ন আমেরিকান জায়নবাদী সংগঠনে ইসরাইলের হয়ে কাজ করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রেই ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ক্ষেত্রে কিছুটা নীতি বদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তিন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ইসরাইলের দখলদারিত্বের ব্যাপারে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা পশ্চিম তীরে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিন্দা জানিয়েছেন। এমনকি তারা বলেছেন, ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরাইলের আচরণের ওপরই তেল আবিবের প্রতি ওয়াশিংটনের সহায়তা কার্যক্রম নির্ভর করবে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল পাস হয়, যাতে ফিলিস্তিনের “রাষ্ট্র” বিষয়টিকে সমর্থনের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের যেকোনো স্থানে ইসরাইলি দখলদারিত্বের কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে তাদের এ প্রচেষ্টা ছিল অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ। অন্যদিকে লেভিনের চিঠিটি ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলেছে। যেখানে ডেমোক্র্যাটদের পদক্ষেপগুলো ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর জুটির বিরুদ্ধে কার্যকরী হতে পারে, সেখানে লেভিনের চিঠি এসবের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে বরং ইসরাইলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক এবং মানবাধিকার আইন মেনে নেয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে। দেশটিতে লেভিনের চিঠিটির মতো আগেও এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার ওই চিঠিতে যতখানি সমর্থন পাওয়া গেছে, তেমন সমর্থন আসেনি আর কখনো। আর এতে একনিষ্ঠভাবে স্বাক্ষরকারী বা সমর্থনকারী যারা আছেন, তাদের মধ্যে যেমন প্রবীণ রাজনীতিকরা আছেন, তেমনি আছেন নবীন কংগ্রেস সদস্যরাও। এছাড়া আফ্রিকান-আমেরিকান, লাতিন, আরব-আমেরিকান, আমেরিকান ইহুদিসহ বিবিন্ন সম্প্রদায়ের কংগ্রেস সদস্যরাও এতে সই করেছেন। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, লেভিনের এমন একটি প্রচেষ্টাকে স্রফে উপেক্ষা করে গেছে বেশির ভাগ মার্কিন গণমাধ্যম। অবশ্য ইহুদিপ্রভাবাধীন গণমাধ্যমে এর চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করাও ভুল। তবে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে দিন দিন মার্কিন জনমত যে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং মাঝে মধ্যেই তার স্ফূরণ ঘটেছে, এটাই আশার কথা। আর জুলুম নির্যাতনের মধ্যেও এভাবেই হয়তো মানবতাগুলো বেঁচে থাকে চিরকাল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..