রাষ্ট্র কী জবাব দেবে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কামাল লোহানী : স্থির জলাশয়। আপনি ঢিল ছুঁড়লেন সেই জলে, সাথে সাথে জলের স্তর ছড়িয়ে পড়লো চতুর্দিকে। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে সব আবার আগের মত হয়ে গেল অর্থাৎ ঢিল মারা জলে যে চঞ্চলতা সৃষ্টি হয়েছিল তা খানিকটা সময় পর আবার স্থির হয়ে গেল। এটাই কিন্তু বাস্তব... এখন রাজধানীতে পুলিশ সপ্তাহ চলছে। পুলিশদের প্রশংসা করে আমাদের সরকারপ্রধান বেশ বক্তব্য দিয়েছেন, আহ্বান জানিয়েছেন আরো জনবান্ধব হওয়ার জন্যে। গত সোমবার ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সরকারি বাসভবনে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। সেখানে কর্মকর্তারা সুদমুক্ত বাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়নের প্রশ্ন তুলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হ্যাঁ সূচক জবাবও দিয়েছেন। শুধু কি তাই, কি যেন একটা বিষয়ে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তৃপ্তি সহকারে, “এটা কিন্তু আপনারা চাননি, আমি নিজে থেকেই বললাম”। এমনই আলোচনা যখন চলছিল অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৈনন্দিন কাজ নয় ‘পুলিশ সপ্তাহ’ যখন চলছে ঠিক তখনই রাজধানী ঢাকায় দু’দুটো ঘটনা যে ঘটে গেল তার কী হবে? ঘটনা দুটো দু’রকম উদ্বেগের কিন্তু একই নিরাপত্তাহীনতার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসাররা সকলে ধরাবাঁধা বাক্যে তাঁদের বক্তব্য দিয়েছেন খবরের কাগজে। পড়ে প্রীত হয়েছি, কিন্তু স্বস্তি তো পাইনি। এদেশের নাগরিক হিসেবে আমার কি স্বস্তি পাওয়ার অধিকার নেই? নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবো না কেউ? শুধুই প্রশ্ন ওঠে মাঝে মাঝে, রাষ্ট্র আমার কোন পথে চলছে? চলছে কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়? রাষ্ট্রের ক্ষমতাধরেরা জবাবে অনেক তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কথা বলবেন বটে, কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা যাবে অভিযুক্তকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা সফল। কিংবা গোটা ঘটনাকে এমনভাবে চেপে যাবেন যেন মনে হবে অমন ঘটনা আদৌ ঘটেনি। সচেতন নাগরিকেরা হয়তো কথার কথা নানা সময়ে লিখবেন অথবা বলবেন, কিন্তু কোনও আন্দোলনে যেতে পারবেন না। কেন? জানিনা, এ আমার নিজের কাছেও প্রশ্ন। ক্ষোভ ও বিক্ষোভ প্রতিবাদ প্রতিরোধ কিংবা ক্রোধ কোনটাই যেন আমরা যুতসইভাবে দেখাতে পারছি না। আমার তো মনে হয় সে কারণেই সমাজে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং সাম্প্রদায়িক অপকর্মের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এতক্ষণ যেসব কথা বললাম তার কারণ হলো সচেতন প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার মানুষ ছায়ানটের নির্বাহী সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সারোয়ার আলীকে বাসায় ঢুকে সপরিবারেও হত্যাচেষ্টার ঘটনায়। তিনি ছাত্রজীবন থেকে আদর্শিক রাজনীতির হাল ধরেছিলেন, সময়ের বিবর্তনে মুক্তিযুদ্ধে ও সংস্কৃতিতেও তাঁর অবদান একইভাবে পরিস্ফূট। তিনি অসাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং জঙ্গিবাদের দুশমন। সেই ডা. সারোয়ার আলীকে উত্তরায় তাঁর বাসভবনে ঢুকে তৃতীয়তলায় মেয়ের পরিবারকে জিম্মি করে চতুর্থ তলায় তাঁকেই হত্যা করার জন্যে দুর্বৃত্ত ঢুকেছিল। এই দুর্বৃত্তরা যে জঙ্গি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। না হলে অমায়িক ব্যবহারের মিষ্টভাষী মানুষ ডা. সারোয়ার আলীকে কেন হত্যার অপচেষ্টা করা হবে এবং কারাই বা করবে। সারোয়ার আলীর মতো একজন উদার মনোভাবসম্পন্ন, সজাগ ও সক্রিয় ব্যক্তির ওপর বাসায় ঢুকে এমন আক্রমণে কি এটাই প্রমাণ হয় না যে, জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সাহস বেড়ে গেছে? আর একটি ঘটনা ঘটেছে, গত রবিবার ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যে ৭টায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে গেছে এক ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ অভিযুক্ত ধর্ষক। জ্ঞানহারা মেয়েটি জ্ঞান ফিরে পেলে বান্ধবীর বাসায় গিয়ে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন। তারপর তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। আমরা শুনে খুশি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেয়েটির অভিভাবকত্ব ঘোষণা করেছেন। দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা শিক্ষায়তনে ব্যাপক প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়েছে এবং এখনও চলছে। দেখলাম বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তা নানা ধরনের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষককে গ্রেফতারের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। খুশি হলাম সবাই- সংশ্লিষ্ট থানা, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, র্যাব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নানা প্রতিষ্ঠান তদন্ত করার দায়িত্ব নিয়েছেন শুনে। যদিও মেয়েটির সম্ভ্রম ফিরিয়ে দেয়া যাবে না তবু কথা শুনে বড্ড স্বস্তিবোধ করছি। সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবুও আশঙ্কা থাকে- ‘তনু’ কিংবা ‘মিতু’র ঘটনা ঘটবে না তো এখানে! ওই ঘটনাগুলোর পরও তো কত তদন্ত অভিযুক্তকে পাকড়াওয়ের আশ্বাসবাণী শুনেছিলাম, তা শুধু বভারম্ভে পরিণত হয়েছে। মেয়েটির দৃঢ়তা ও সাহসের প্রশংসা করা হয়েছে সংবাদপত্রে দেখে ভালো লাগলো। কিন্তু ঐ শিক্ষার্থীর সামাজিক পরিমণ্ডল যে কতভাবে বিষাক্ত হয়েছে তা কি সবাই ভেবে দেখেছেন? তাই বলছিলাম ঘটনাটা যেন বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে না যায়। রাষ্ট্রকে অনুরোধ করবো, তদন্ত যে ভাবেই করুন না কেন ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তির বিধান করুন। না হলে দেশটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। বেপরোয়া ধর্ষণ যাতে বন্ধ হয় তার চেষ্টা করুন কায়মনোবাক্যে। রাষ্ট্র যদি রাজনীতিবিহীন হয়ে যায়, তাহলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নানা অপকর্ম ও কুকর্ম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর এই সামাজিক অপরাধ অনাচার দুবৃর্ত্তায়ন নানা অগ্রহণযোগ্য তৎপরতা রোধ করাই আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্য হওয়া উচিৎ। ওরা একেবারে ‘গঙ্গাজলে ধোয়া তুলসীপাতা’ হবে এটা আশা করি না। বিশাল বাহিনীর মধ্যে নানা কিছিমের মানুষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো গোটা বাহিনীকে বাংলার গর্ব-গৌরব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। আর তার জন্য অবশ্যই এবং অবশ্যই রাজনীতির প্রয়োজন। দেশে এত ধর্ষণ আর দুর্নীতির কাহিনী শোনা যাচ্ছে। কিংবা জঙ্গিবাদীরা ধর্মীয় মিথ্যাচারের মাধ্যমে মানুষ হত্যার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু কেন? তারও জবাব রাষ্ট্র রাজনীতিহীন হয়ে পড়ার মধ্যে নিহিত। দেশ পরিচালকেরা ভেবে দেখবেন, এই যে দুটো ঘটনার উল্লেখ করলাম এরা পরস্পর ভিন্ন প্রকৃতির হতে পাওে, কিন্তু ‘নিরাপত্তাহীনতাই’ কি প্রধান বিষয় নয়? সেই নিরাপত্তা দেয়া, আবার জিজ্ঞাসা করি, কাদের দায়িত্ব? মানুষের জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা যেমন একটি প্রধান বিষয় তেমনই রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রেও রাজনীতির কোনও বিকল্প নেই। যদি তাই হবে তা হলে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন মাতৃভূমিতে এমন সব নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা কেন ঘটছে? কে দেবে এর জবাব?

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..